১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে মঙ্গল পাণ্ডের পাশাপাশি যিনি সংগঠিত সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন, ইতিহাসে তিনি আজও উপেক্ষিত
ঢাকা, বাংলাদেশ — ৬ জানুয়ারি ২০২৬
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব উপমহাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এই বিদ্রোহ কেবল দিল্লি, মিরাঠ বা কানপুরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও রচিত হয়েছিল এক গৌরবময় অথচ বিস্মৃত ইতিহাস। এই অধ্যায়ের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন ৩৪ নম্বর ‘নেটিভ বেঙ্গল পদাতিক বাহিনী’র হাবিলদার রজব আলী খাঁ—একজন সংগঠিত সামরিক বিদ্রোহের নায়ক, যিনি আজও জাতীয় ইতিহাসে উপেক্ষিত।
▪️ বিদ্রোহের লাভা: ৩৪ নম্বর নেটিভ বেঙ্গল রেজিমেন্ট
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক বাহিনীর ভেতরে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের ফলেই ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সূচনা। এই বিদ্রোহের অন্যতম কেন্দ্র ছিল ৩৪ নম্বর নেটিভ বেঙ্গল পদাতিক বাহিনী। ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডের বিদ্রোহের পর রেজিমেন্টটি আংশিক ভেঙে দেওয়া হলে অসন্তোষ আরও গভীর হয়।
এই রেজিমেন্টের উল্লেখযোগ্য অংশ মোতায়েন ছিল চট্টগ্রামে। ব্যারাকপুরের আগুন এখানকার সিপাহিদের হাত ধরেই ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায়। ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেখানে মঙ্গল পাণ্ডে একক বিদ্রোহ করেছিলেন, সেখানে হাবিলদার রজব আলী প্রায় ৪০০ সশস্ত্র সিপাহিকে সংগঠিত করে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
▪️ চট্টগ্রাম বিদ্রোহ: এক বিরল বিজয়
১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর রাতে হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। সিপাহিরা রাইফেলের ফাঁকা গুলি ছুড়ে বিদ্রোহের সংকেত দেয়। তারা প্রথমেই কেন্দ্রীয় কারাগার ভেঙে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্ত করে এবং পরে কোষাগার ও অস্ত্রাগার দখল নেয়।
এই অভিযানের ফলে প্রায় ৩০ ঘণ্টা চট্টগ্রাম সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত ছিল—যা তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ শহরের ক্ষেত্রে ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
▪️ পাহাড়ি যাত্রা ও মেজর বাইংয়ের পরাজয়
চট্টগ্রাম ছাড়ার পর বিদ্রোহীরা ত্রিপুরার দিকে অগ্রসর হলেও প্রতিরোধের মুখে কৌশল পরিবর্তন করে দুর্গম পাহাড় ও অরণ্য পাড়ি দিয়ে সিলেটের দিকে যাত্রা করে। ১৮ ডিসেম্বর সিলেটের লাতু এলাকায় সংঘর্ষে ব্রিটিশ কমান্ডার মেজর বাইং নিহত হন—যা বিদ্রোহীদের জন্য বড় এক সামরিক সাফল্য।
▪️ মালেগড়ের যুদ্ধ ও অন্তর্ধান
১৮৫৮ সালের ৯ জানুয়ারি করিমগঞ্জের মালেগড় টিলায় চূড়ান্ত সংঘর্ষে স্থানীয় বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বিদ্রোহীরা পরাজিত হন। প্রায় ৭০ জন সিপাহি শহীদ হন। এই যুদ্ধের পর হাবিলদার রজব আলীর পরিণতি রহস্যে ঢাকা।
একাধিক ব্রিটিশ নথি অনুযায়ী, তিনি মণিপুরের অরণ্যে অন্তর্ধান করেন। অন্যদিকে কিছু জীবনীকার দাবি করেন, তাকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রামে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে ফাঁসি দেওয়া হয়—যদিও এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য ব্রিটিশ দলিল নেই।
▪️ কেন তিনি ইতিহাসে উপেক্ষিত
চট্টগ্রামের বিদ্রোহ মূল রাজনৈতিক কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় এবং ব্রিটিশদের নথি ধ্বংসের কারণে এই অধ্যায় ইতিহাসের পাদটীকায় রয়ে গেছে। স্বাধীনতার পরও রজব আলীকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা না হওয়াই তার বিস্মৃতির প্রধান কারণ।
▪️ উত্তরাধিকার ও স্মৃতি
আজও আসামের করিমগঞ্জে মালেগড় টিলায় নির্মিত ওয়ার মেমোরিয়ালে প্রতিবছর ১৮ ডিসেম্বর শ্রদ্ধা জানানো হয়। চট্টগ্রামে একসময় তার নামে সড়ক থাকলেও তা এখন হারিয়ে গেছে। স্থানীয় ইতিহাসবিদরা পাঠ্যপুস্তকে তার জীবনী অন্তর্ভুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নামকরণের দাবি জানিয়ে আসছেন।