সংবাদ সম্মেলনে প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ— রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠান অস্থিতিশীল করার চেষ্টা
ঢাকা, বাংলাদেশ — ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
রাজধানীর মীরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের বরখাস্তকৃত সহকারী শিক্ষক (সংগীত) বিপাশা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, শৃঙ্খলা ভঙ্গ, সহিংস আচরণ, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব খাটানো এবং ধারাবাহিক অপপ্রচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে গত বছরের মে মাসে তাকে বরখাস্ত করা হলেও তিনি এখনো প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
শনিবার বেলা ১১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন মীরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক জিনাত ফারহানা। তিনি বরখাস্ত শিক্ষকের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে ২০১৫ সালে বিপাশা ইয়াসমিনকে সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে এবং অনুমোদিত শিক্ষক-কর্মচারী প্যাটার্নের বাইরে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আস্থাভাজন এবং একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নজরুল ইসলামের স্ত্রীর পরিচয় ব্যবহার করে, পাশাপাশি ঢাকা-১৬ আসনের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর প্রভাবে তার নিয়োগ কার্যকর করা হয়।
পরবর্তীতে ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের সরাসরি হস্তক্ষেপে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তার চাকরি স্থায়ী করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়।
চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অমান্য, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, দেরিতে উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে কর্তৃপক্ষকে চাপে রাখার প্রবণতা তার নিয়মিত আচরণে পরিণত হয়।
একপর্যায়ে তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিথ্যা যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন। এ বিষয়ে গঠিত তিনটি তদন্ত কমিটিতেই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এমনকি অভিযোগে তার পক্ষে অবস্থান না নিলে শিক্ষার্থীদের দিয়ে যৌন নির্যাতনের মামলা করানোর হুমকিও দেন তিনি। এতে আতঙ্কিত হয়ে ১৪ জন পুরুষ শিক্ষক মিরপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বিপাশা ইয়াসমিন নিজেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে যুক্ত করে ভুয়া পরিচয়ে আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকেন। ওই ব্যানার ব্যবহার করে তিনি একাধিকবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে শিক্ষকদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। পাশাপাশি ১৯ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্র হত্যার মিথ্যা মামলা দায়ের করেন, যা শিক্ষা পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মিরপুর-১০ সেনা ক্যাম্পের কর্মকর্তারা তাকে একাধিকবার সতর্ক করেন বলেও দাবি করা হয়।
আরও অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী সরকারের সময়কার প্রভাবশালী কিছু সচিব ও মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ও সহকর্মীদের ওপর প্রভাব বিস্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন। কোনো অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করতেন বলে একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবক অভিযোগ করেছেন।
প্রধান শিক্ষক জিনাত ফারহানা অভিযোগ করেন, বরখাস্ত শিক্ষক বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কুরুচিপূর্ণ, বিকৃত ও মানহানিকর ভিডিও ও কনটেন্ট তৈরি করে তা ছড়িয়ে সংশ্লিষ্টদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, নিজের অনৈতিক কর্মকাণ্ড আড়াল এবং প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব দুর্বল করার উদ্দেশ্যে তিনি মাউশির কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে প্রধান শিক্ষকসহ একাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একের পর এক অভিযোগ দায়ের করেন। অধিকাংশ অভিযোগ তদন্তে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলেও ধারাবাহিক অপপ্রচারের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।
বরখাস্ত শিক্ষকের দেওয়া বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে মাউশি প্রধান শিক্ষক জিনাত ফারহানার সরকারি বেতন ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। এ বিষয়ে দায়ের করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ওই আদেশ স্থগিত ঘোষণা করেন।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের লিখিত অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে বিপাশা ইয়াসমিনের কর্মকাণ্ড বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ ও মূল্যবোধ রক্ষার স্বার্থেই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সহকারী প্রধান শিক্ষক আহমিদউল্লা কাসেমী, প্রভাতি শাখার ইনচার্জ সুয়ারা সুলতানা, দিবা শাখার ইনচার্জ জেসমিন আহমেদসহ অন্যান্য শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।