কর-ভ্যাট কমানো থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তরুণ ও আইসিটি খাতে ব্যাপক সংস্কারের ঘোষণা
ঢাকা, বাংলাদেশ — ২০ জানুয়ারি ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেলে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কার আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আয়োজিত পলিসি সামিটে দলটির ঘোষিত এসব পরিকল্পনা ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার আয়োজিত এই পলিসি সামিটে জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রস্তাবিত অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তরুণ উন্নয়ন, আইসিটি ও রেমিট্যান্স খাতের নীতিগত রূপরেখা তুলে ধরে। বিষয়ভিত্তিক পলিসি পেপার উপস্থাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়।
স্বাগত বক্তব্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ‘নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে দলের ভবিষ্যৎ ভাবনা ও নীতিগত লক্ষ্য তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরা অংশ নেন।
অর্থনীতি ও ব্যবসা খাতে পরিকল্পনা
ঘোষিত পরিকল্পনায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের কথা জানানো হয়। দীর্ঘমেয়াদে ট্যাক্স হার ১৯ শতাংশ এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়, যেখানে এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা একীভূত থাকবে।
আগামী তিন বছরে শিল্পখাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মূল্য না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বন্ধ কলকারখানা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে চালু করে এর ১০ শতাংশ মালিকানা শ্রমিকদের দেওয়ার পরিকল্পনাও জানানো হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণের ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরা হয়।
শিক্ষা খাতে প্রস্তাবনা
গ্রাজুয়েশন শেষে চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ দুই বছর মেয়াদে পাঁচ লাখ গ্রাজুয়েটকে মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ (কর্জে হাসানা) দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। পাশাপাশি মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে এক লাখ শিক্ষার্থীকে মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ এবং প্রতিবছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইডেন কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজ ও হোম ইকোনোমিক্স কলেজ একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বড় কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের কথাও জানানো হয়।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা
৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক ও ৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি জেলায় একটি করে মোট ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে গর্ভধারণ থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও জানানো হয়।
তরুণ, আইসিটি ও কর্মসংস্থান পরিকল্পনা
তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের জন্য নতুন মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ, প্রতিটি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ এবং প্রতিটি জেলায় ‘জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
আইসিটি খাতে ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা করে ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ আইসিটি জব সৃষ্টি এবং ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যের কথা জানানো হয়। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল রপ্তানির জন্য জাতীয় পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
রেমিট্যান্স খাতে লক্ষ্য
দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে ৫ থেকে ৭ বছরের মধ্যে রেমিট্যান্স আয় দুই থেকে তিনগুণ বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসী গবেষক, শিক্ষক ও পেশাজীবীদের দেশে ফিরিয়ে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’ ব্যবস্থার কথা তুলে ধরা হয়।