দীর্ঘদিন ধরে গণভোটের প্রশ্নে আপত্তি জানিয়ে আসা বিএনপি শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণে রাজি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “গণভোট হলো জনগণের সার্বভৌম মতামতের প্রতিফলন এটি এড়িয়ে যাওয়া গণতন্ত্রকে অস্বীকার করার শামিল।” তার এই মন্তব্যে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে বিএনপির এই সিদ্ধান্ত কি কৌশলগত, নাকি গণ-চাপের ফল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির এই অবস্থান পরিবর্তন বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় মোড় ঘুরানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। দলটি এতদিন ধরে “গণভোট নয়, জাতীয় ঐকমত্য চাই” এই অবস্থানে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জনমত, নাগরিক আন্দোলন এবং নতুন সংবিধান রচনার দাবিতে গঠিত নাগরিক ফোরামের চাপ বিএনপিকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে বলে মনে করা হয়
জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সংবাদ সম্মেলনে বলেন,
“আমরা শুরু থেকেই জনগণের রায়কে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে। গণভোট মানে জনগণ সরাসরি নিজের মতামত দেবে কোনো দলীয় এজেন্ডা নয়, এটা জাতির সিদ্ধান্ত। বিএনপিও অবশেষে তা উপলব্ধি করেছে এটাই রাজনীতির ইতিবাচক দিক।”
তিনি আরও বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখন বুঝতে শুরু করেছে যে, দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ হলো জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। তাহের দাবি করেন, “এটি ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং জনঅংশগ্রহণের রাজনীতি। বাংলাদেশ এখন সেই পথে হাঁটছে।”
বিএনপির অবস্থান পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট:
বিএনপি গত কয়েক মাস ধরে গণভোট ইস্যুতে অনীহা প্রকাশ করছিল। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার বলা হচ্ছিল, “গণভোট এখন অপ্রাসঙ্গিক দেশের বর্তমান সংকটের সমাধান রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই হতে হবে।”
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক গতিপ্রবাহ, বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিএনপিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
একাধিক সূত্র বলছে, বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে একাংশ বিশ্বাস করেন, গণভোটে অংশ না নিলে দলটি জনগণের সঙ্গে সংযোগ হারাবে। তাই শেষ পর্যন্ত তারা গণভোটে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. ফরিদুল ইসলাম মনে করেন, বিএনপির এই সিদ্ধান্ত কৌশলগত হলেও এটি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক।
তিনি বলেন, “গণভোটে অংশ নেওয়া মানে জনগণের রায়কে মেনে নেওয়া। এটা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটাবে।”
অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, বিএনপি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার জন্য। কারণ, গণভোট থেকে দূরে থাকা মানে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাওয়া।
জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, তার দল গণভোটকে জাতীয় ঐক্যের একটি ভিত্তি হিসেবে দেখে। তিনি বলেন,
“আমরা বিশ্বাস করি, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করবে। কোনো বিদেশি চাপ বা গোষ্ঠীর প্রভাব এখানে কাজ করবে না।”
তিনি আরও বলেন, এখন সময় এসেছে সব রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতার রাজনীতি থেকে বের হয়ে জাতীয় স্বার্থে একসাথে কাজ করার। তাহের আহ্বান জানান, গণভোটকে “নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপনের এক ঐতিহাসিক সুযোগ” হিসেবে দেখতে।
বিএনপির গণভোটে রাজি হওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; এটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। জামায়াতের নায়েবে আমির তাহেরের বক্তব্য সেই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এখন দেখার বিষয়, গণভোটকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো কেমন ভূমিকা নেয় এবং জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করবে
সূত্র:
Daily Crisis BD| রাজনৈতিক ডেস্ক | ঢাকা | ১৫ অক্টোবর ২০২৫