জুলাই বিপ্লবে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অনন্য সাহস, ত্যাগ ও ঐতিহাসিক অবদানকে স্মরণ করতে রাজধানীর বিএমএ ভবন মিলনায়তনে ‘জুলাইয়ের রক্তাক্ত জুব্বা: মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অবদান’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারের আয়োজন করেছে ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “১৭-১৮ তারিখের দিকে যখন আন্দোলন একপর্যায়ে স্তিমিত হয়ে পড়েছিল, তখন মূলত দুটি শক্তি এই আন্দোলনের অভূতপূর্ব পুনর্জাগরণ ঘটায়—যাঁদের মধ্যে অন্যতম হলো আমাদের অকুতোভয় মাদ্রাসা শিক্ষার্থী এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, এ ভূখণ্ডের মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ে যুগে যুগে দেশের ওলামায়ে কেরাম অসামান্য জীবন দিয়েছেন এবং ত্যাগ স্বীকার করেছেন। গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জুব্বা রক্তাক্ত হয়েছে—শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে। এই জুব্বা মূলত স্বৈরাচারবিরোধী বিদ্রোহ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পবিত্র প্রতীক। তাই বর্তমান সরকারের কাছে আমরা জোরালো দাবি জানাচ্ছি যে, এই বীর মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক ত্যাগকে অবশ্যই যথাযথ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন জুলাই নিয়ে ব্যবসা করা যাবে না। কিন্তু জুলাইয়ের মূল আকাঙ্ক্ষা হলো রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিবর্তন। আমরা যখনই সেই পরিবর্তনের কথা বলতে যাই, তখন তা জুলাই চেতনা বিক্রি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মূলত কেউ জুলাই বিক্রি করছে না। অতীতে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ কথা বলে বিগত ৫০ বছর ধরে আওয়ামী লীগ এ দেশে গণতন্ত্র হত্যা করেছে, গুম ও খুনের রাজনীতি টিকিয়ে রেখেছে এবং দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই কথিত চেতনার কথাটিই বর্তমানে বিএনপির মুখে সবচেয়ে বেশি শোনা যায়।”
নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, “জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে আমাদের প্রধান আকাঙ্ক্ষা ও জনগণের কাছে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল একটি নতুন বাংলাদেশ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন, যার ভিত্তি হবে কাঠামোগত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। আজ সেই সংস্কারের কথা বললেই তা নিয়ে আপত্তি তোলা হচ্ছে। অথচ জনগণ খুব ভালোভাবেই জানে যে, জুলাই অভ্যুত্থানের সুফল হিসেবে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করছে বিএনপি। তারেক রহমান লন্ডন থেকে নিরাপদে দেশে ফিরেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিলং থেকে ফেরত এসেছেন এবং বিএনপি বর্তমানে একধরনের দায়িত্বহীন ক্ষমতা লাভ করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে আমরা পেয়েছিলাম ক্ষমতাহীন বড় দায়িত্ব।”
সংবিধান ও নির্বাচন প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “সংবিধান সংস্কার আদেশ যদি অবৈধ ঘোষিত হয়, তবে সেই আদেশ প্রদানকারী রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে সরকার কেন কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না? কিংবা যে নির্বাচন কমিশনার বেআইনিভাবে শপথ পড়িয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধেও বা কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?”
অবিলম্বে সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নের জোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “এ দেশের নির্বাচন প্রচলিত সংবিধান অনুযায়ী হয়নি। বিপ্লবের পরবর্তী জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং বিশেষ আদেশের মধ্য দিয়েই মূলত নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। মূল সংবিধানের কোথাও ২০২৪ সালে কোনো নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল না, বরং নিয়ম অনুযায়ী ২০২৯ সালে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। ফলে বর্তমান সরকারকে অবশ্যই এটি অনুধাবন করতে হবে যে, ৫ আগস্টের পরবর্তী রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা কোনো সাধারণ সংবিধানের ধারা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এটিকে সম্পূর্ণরূপে জুলাই বিপ্লবের জনগণের বিপ্লবাত্মক আকাঙ্ক্ষা দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। জনগণের সেই মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তন এবং একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা।”
তিনি আরও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সরকার সংবিধান সংশোধন কমিটির নামে যে প্রহসনমূলক তৎপরতা চালাচ্ছে, সেখান থেকে অবিলম্বে সরে এসে জনগণের গণভোটের রায় দ্রুত বাস্তবায়ন করুন। অন্যথায় দেশের ওলামায়ে কেরামসহ জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত সকল ছাত্র-জনতার শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে আমরা আবারও রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হব। যদিও আমরা বর্তমানে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এগোচ্ছি, তবুও আমরা চাই আলোচনার মাধ্যমেই এর সমাধান আসুক।”
দেশের রাজনৈতিক বিভিন্ন তথ্য ও সরকারি প্রজ্ঞাপন দেখতে বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন এবং নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্যের জন্য বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন-এর পোর্টাল ভিজিট করা যেতে পারে। এছাড়া মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট-এর প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করা যেতে পারে।