বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্বতা ও অদূরদর্শী নেতৃত্ব থেকে বিএনপি সরে না আসায় সাত মাসে সরকার একেবারে লেজেগোবরে জড়িয়েছে।
তিনি বলেন, এই সময়ের মধ্যে প্রায় চারজন মন্ত্রী-এমপি বিদায় নিয়েছেন। সরকারে থেকে দায়িত্ব পালন করার সময় এত অপরিপক্ব, অদক্ষ, অরাজনৈতিক বক্তব্য এবং অরাজনৈতিক নেতৃত্ব আমরা আগের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেখিনি।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ লেবার পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজার রহমান ইরান। বক্তব্য রাখেন ১১ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশে বহু ভুঁইফোড় রাজনৈতিক দল নিবন্ধন নিয়েছে। তারা নানান তদবির, লেজুড়বৃত্তি করেছে। মন্ত্রিত্ব, পদ-পদবি, ভাগ-বাটোয়ারার কারণে দল করে। কিন্তু অনেক লোভ-লালসার প্রস্তাব সামনে থাকার পরেও রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ না করে, দেশপ্রেমিক, আধিপত্যবাদবিরোধী ইসলামী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে লেবার পার্টি একটা উদাহরণ তৈরি করেছে। এজন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলের পক্ষ থেকে আমি বাংলাদেশ লেবার পার্টির আজকের এই ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ধন্যবাদ জানাই, শুভকামনা করি।
তিনি বলেন, শ্রমিক-মজুরদের অবস্থা এখন বাংলাদেশে ভালো নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের অসন্তোষ, দুই-চার দিন পরপর গার্মেন্টস সেক্টরে, শিল্প সেক্টরে অসন্তোষ, রাস্তা অবরোধ দেখে ওনারা বিরোধী দলকে দায়ী করেন। বলেন, বিরোধী দলের উসকানিতে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি তার চেয়েও বেশি। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। প্রতিনিয়ত জনদুর্ভোগ বাড়ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ছে, শ্রমিক পরিবারগুলো এই কঠিন পরিস্থিতিতে জীবন নির্বাহ করতে পারছে না। গার্মেন্টস শ্রমিকসহ সব পেশার শ্রমিক-মজুরদের বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের যে দাবিতে শ্রমিকরা আজ আন্দোলন করছে, সেই আন্দোলন থামানোর জন্য মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সে দাবি পূরণ করা সরকারের কর্তব্য।
সরকারকে সতর্ক করে তিনি আরও বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান সমস্ত অপরাধের বিরুদ্ধে অনমনীয়, আপসহীন ভূমিকায় নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। আপনি এ দেশের অস্থিতিশীলতার জন্য তাঁকে দায়ী করার অর্থ হলো, নিজেদের চাঁদাবাজি, দখলদারি, অপরাধ, মাদক, সন্ত্রাস এবং দুর্নীতিকে ঢাকার আর কোনো পথ নেই বলে আপনি এই দেশপ্রেমিক বিরোধী দলের ওপরে দায় চাপানোর চেষ্টা করছেন।
সরকারকে উদ্দেশ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছে আপনার নেটওয়ার্ক। আপনি উত্তরবঙ্গে গিয়ে মঙ্গলবার বলেছেন, পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্যে আপনি তথ্য পেয়েছেন, এর পেছনে বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র আছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যে গোয়েন্দা বাহিনী, যে গোয়েন্দাগিরি, যে সেটআপ আওয়ামী লীগ রেখে গেছে, যারা নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে জঙ্গি বানিয়ে ক্রসফায়ারে দিয়েছে, রিমান্ডে, আয়নাঘরে নিয়েছে, সেই গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করে আপনি এখন বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপাবেন? যে পুলিশ বাহিনীর সেটআপ যারা রেখে গিয়েছিল, সেসব গোয়েন্দা বাহিনী এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে এখনো আপনি সরাননি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আপনাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে, দলীয়করণের বিরুদ্ধে কথা বললে আপনারা বলেন অস্থিতিশীলতা। বিরোধী দলের দায়িত্বই তো হচ্ছে সরকারের অপকর্ম জাতির সামনে তুলে ধরা। তাহলে কি কিছুই বলা যাবে না? এটিই তো ফ্যাসিবাদের পথ!
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আর হাসিনার দোষটা কী ছিল? তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললেই বলত রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র। নিরীহ-নিরপরাধ লোকদের ধরে এনে জঙ্গি বানিয়ে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আটকে রেখেছেন। সেই খারাপ পথেই আপনারা যাত্রা শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, সরকার এখন বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ করতে চায়। আমরা আগেও দলীয়করণ দেখেছি, কিন্তু বর্তমান সরকারের মন্ত্রী, চিফ হুইপরা নির্লজ্জভাবে দলীয়করণের কথা বলেন! চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বরগুনায় গিয়ে বলেছেন, সব ইউনিয়নে যদি বিএনপির প্রার্থীকে না জেতাও, তাহলে আমরা উন্নয়নের কোনো বরাদ্দ দেব না। এটা কি মন্ত্রীর পদমর্যাদায় চিফ হুইপের বক্তব্য হতে পারে? সরকারে থেকে এ কথা বলতে পারেন পার্লামেন্টের একজন চিফ হুইপ?
তিনি বলেন, সাত-আট মাস হয়ে গেল, বিরোধী দল গণভোটের গণরায় কার্যকর করার জন্য এ পর্যন্ত যে আন্দোলন করেছে- দুটি লংমার্চ করেছে, আরেকটি লংমার্চ ৩১ তারিখে। এর মধ্যে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছেন, সার-সংকট তৈরি করেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বাড়িয়েছেন, খুন, ধর্ষণ, নৃশংসতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। দলীয়করণে সব সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, সরকারি পদ, স্বায়ত্তশাসিত পদ, সব জায়গায় সরকার- ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপির লোক বেছে বেছে বসিয়েছে। এসবের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলন করেছি। কই, আমরা তো একদিন হরতাল করিনি, অবরোধ করিনি, একটা গাড়িতে আগুন দিইনি, ভাঙচুর করিনি। এতেই আপনারা অস্থিতিশীল বলেন?
গোলাম পরওয়ার বলেন, ৭০ ভাগ মানুষের গণরায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা, এত বড় বেইমানি করা একটি শাসক দলের বিরুদ্ধে এখনো আমরা কোনো সহিংস আন্দোলন করিনি। কারণ আমরা দেশকে ভালোবেসে দেশকে অস্থিতিশীল হতে দিইনি। এখনো এই সরকারের সময় আছে পার্লামেন্টে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে সংবিধান সংস্কারের যে প্রস্তাব ঐকমত্য কমিশনে হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়ন করুন। আপনাদের সেই সুযোগ দিচ্ছি, আসুন আলোচনা করি।
তিনি বলেন, গণভোটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে বলেছিলেন। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, বিএনপিও গণভোটে ‘হ্যাঁ’-তে ভোট দিয়েছিল। সেই ব্যালটের চারটি প্রশ্নে ৭০ ভাগ লোক ‘হ্যাঁ’-তে ভোট দিয়ে বলেছে যে ৮৪টি ঐকমত্যের বিষয়ে তারা ‘হ্যাঁ’ বলেছে। গণভোটে ৭০ ভাগ লোকের ভোটের মধ্য দিয়ে বিএনপির সমস্ত নোট অব ডিসেন্ট খারিজ হয়ে গেছে। এই জুলাই সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের গণরায় মেনে নিয়ে দেশকে স্থিতিশীল অবস্থায় রাখার দায়িত্ব এখন সরকারের।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা জুলাই সনদকে ধারণ করি। জুলাই শহীদ, জুলাই যোদ্ধাদের পেছনে জামায়াতে ইসলামী এবং বিরোধী দল তাঁদের বাড়িতে বাড়িতে চিকিৎসা, সাহায্য নিয়ে গিয়েছে। আপনারা সরকারি দলের কয়জন শহীদের বাড়িতে গিয়েছেন? কতজন জুলাই যোদ্ধাকে আপনারা সেবা দিয়েছেন তার কোনো জবাব নেই। যারা জুলাই ধারণ করে, তারা কি গণভোটের এই ৭০ ভাগ লোকের রায়কে প্রত্যাখ্যান করে? পার্লামেন্টে গণভোটকে বাতিল করে? এটার অর্থই হলো জুলাইকে ধারণ না করা।
তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, দেশটাকে অরাজকতা, অস্থিরতার আগুনের মধ্যে ঠেলে দেবেন না। দেশে অশান্তি তৈরি করে, রাজপথকে উত্তপ্ত করার দিকে ঠেলে দিয়ে, আপনারাই ভুল রাজনীতি করে আওয়ামী লীগকে এখানে ইন করার সুযোগ করে দিচ্ছেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, অতীতে বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধভাবে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যেমন রাজপথে ছিলাম, আজকেও সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে যদি ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে একসঙ্গে মেনে নিতে পারতাম, তাহলে কোনোভাবেই আওয়ামী লীগ এই রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পেত না।
আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-যশোর-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া তৃতীয় দফার ঐতিহাসিক লংমার্চে দেশবাসীকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। লেবার পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষ থেকে লেবার পার্টির প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান গোলাম পরওয়ার।