মানি, অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের অনেক ভুল-ত্রুটি ছিল। মাহফুজ-নাহিদ-আসিফরা হয়তো অনেককে যথেষ্ট সময় দিতে পারেনি, অনেককে একোমোডেট করতে গিয়ে দেরি করেছে, হয়তো কিছু সম্পর্কের ক্ষেত্রে পূর্বতন ব্যক্তিগত চিন্তা ও দ্বন্দ্ব প্রভাব রেখেছে। কিন্তু তারা কখনো ‘এজেন্সি’র গুটি হয়ে খেলে নাই। রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে ‘রাজনৈতিক’ ও গণমুখী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যা দুইদিন আগের প্রথম আলো-ডেইলি স্টার কাণ্ডে আবারও প্রমাণিত।
বলা বাহুল্য, এটা আমাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতালব্ধ।
কিন্তু অভ্যুত্থানের ঠিক পরপরই অভ্যুত্থানের জনস্বীকৃত নেতৃত্বের বাইরে আরেক ধরণের ‘ছদ্ম নেতৃত্ব’ তৈরি করার প্রক্রিয়া শুরু করলো কেউ কেউ। এর আপাতঃ উদ্দেশ্য দুইটা – অভ্যুত্থানের নেতৃত্বকে ভিলিফাই করা এবং তাদের রিপ্লেস করে আজ্ঞাবহ নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করা। এই প্রজেক্টে বর্তমান সরকারের কিছু উপদেষ্টাও গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করেছে। আমলা-এজেন্সি এসব তো আছেই।
এই প্রজেক্টের অংশ হিসাবে প্রথমেই অভ্যুত্থানের সকল জনস্বীকৃত নেতৃত্ব এবং ছাত্র উপদেষ্টাদের ‘জুলাইয়ের গাদ্দার’ বানানো হলো। অসংখ্য ফেসবুক পেইজ, বট আইডি খুলে গালিগালাজ করা হলো। এই সরকারের মেয়াদে প্রায় হাজারখানেক আন্দোলন হয়েছে; কিছু জেনুইন সংক্ষুদ্ধতার জায়গা থেকে, আবার অনেকগুলো আওয়ামী ফান্ডেড ও সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে। যখনই জেনুইন সংক্ষুদ্ধতার জায়গা থেকে ছাত্রদের কোনো আন্দোলন হয়েছে, তখনই মোকাবেলার জন্য পাঠানো হয়েছে ছাত্র উপদেষ্টাদের। এমনকি সংশ্লিষ্ট সমস্যা ও মন্ত্রণালয়ের সাথে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ইস্যুর সাথে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের বা সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের মন্ত্রণালয়ের কি সম্পর্ক ছিল? কিন্তু তাদেরকে এই বিক্ষুদ্ধ ছাত্রদের সামনে দাঁড় করানো হলো। অথচ শিক্ষা উপদেষ্টা গেলেন না। গৃহায়ণ ও গণফূর্ত উপদেষ্টা গেলেন না। নাহিদ ইসলাম প্রথমবারের মতো ‘ভুয়া’ স্লোগান শুনলেন। আর মাহফুজ আলম হলেন ‘বোতল’, ‘সান্ডা’। বিসিএস ফলপ্রত্যাশীরা অনশনে বসেছে। পাঠানো হলো সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদকে। তিনি অনশন ভাঙালেন। তবে দাবি পূরণ না হওয়ায় এখনও গালি খাচ্ছেন ‘গাদ্দার’ হিসাবে। এভাবে সরকারের অন্য মন্ত্রণালয়ের ভুলের দায়ভারও এই তিন ছাত্রনেতাকে নিতে হলো। এভাবেই সরকারের কেউ কেউ, বাইরের স্যুডো নেতারা, বিভিন্ন এজেন্সি মিলে অভ্যুত্থানের জনস্বীকৃত নেতৃত্বকে ‘গাদ্দার’ ও ভিলেন বানালো।
প্রজেক্টটা রানিং থাকাবস্থায় রিপ্লেসমেন্টের কাজ শুরু হলো। এক ‘ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট’এর মাধ্যমে উঠে আসলো অভ্যুত্থানের প্রকৃত, যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব সালমান। সালমান আল-জাজিরাতেও প্রকটিত হলো। মিডিয়াও ফ্রেমিং হলো – সালমানরাই প্রকৃত বিপ্লবী। সকল সিদ্ধান্ত তারাই নিতো। অভ্যূত্থানের মাস্টারমাইন্ডও তারা। এভাবে ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারা হলো। এক, অভ্যুত্থানের প্রকৃত নেতৃত্বকে রিপ্লেস করা গেলো। ফলে সরকারের ভেতর তাদের সৃষ্টি করা চাপ এখন অনেক কম অনুভূত হবে। দুই, অভ্যুত্থানের ইউনিফায়িং ক্যারেক্টারকে মুছে ফেলার পয়লা ধাপ সম্পন্ন হইলো। যাতে অভ্যুত্থান জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের চেয়ে সালমানদের ‘মেটিকুলাস’ ডিজাইনের অংশ বেশি মনে হয়। অথচ এস্টাবলিশমেন্ট জানে – সালমানরা ইনহিয়ারেন্টলি জটিল পরিস্থিতি না ইউনিফায়িং ক্যারেক্টার হতে পারবে; না পারবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারবে। ফলে জনগণ একটা সময় গিয়ে চিটেড ফিল করবে। এটার প্রভাব মাত্র শুরু হয়েছে। সামনে এই সংকট আরো ঘনীভূত হবে।
তবে আপাততঃ এই দুই প্রজেক্ট বাস্তবায়িত। ফলে কেউ এখন কাউকে চিনে না। সামনে কেবল বাস্তবায়িত প্রজেক্টের ফলাফল দেখা যাবে। গতকাল রাত থেকে অনেকে অনেক হিসাব মিলাতে পারছেন না। আশা করি, এবার পারবেন। মাহফুজ, নাহিদ, আসিফদের অনেকগুলো ভুলের মধ্যে একটা গুণ হলো – একশ’টা গালি খেয়েও দায়িত্ব নেওয়া, হাল ধরা এবং টালমাটাল পরিস্থিতিতেও মোরলি ও পলিটিক্যালি রাইট পজিশনটা নেওয়া। আমি এই ‘গাদ্দার’দের সাথে আছি।
২২ ডিসেম্বর ২০২৫
অভ্যুত্থান পরবর্তী ‘ছদ্ম নেতৃত্ব’ প্রজেক্ট ও জনস্বীকৃত নেতৃত্বকে ভিলিফাই করার রাজনীতি
Related Posts
ডেইলিক্রাইসিস বিডি
আপডেটের জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
আমাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের
সর্বশেষ খবর জানতে সাবস্ক্রাইব করুন
Office Address
29, Toyenbee Circular Road (5th Floor),
Dainik Bangla Moore,
Motijheel C/A, Dhaka-1000