ফাইজ তাইয়েব আহমেদ: বাংলাদেশ-চীন ডিপ্লোম্যাসির বিটুইন দ্য লাইন রিড!
২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর কেবল ১৫টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি আর ১৬ দফা যৌথ ইশতেহারের হিসাব নয়। ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বৃহৎ শক্তি হিসেবে বেইজিংকে বেছে নেওয়া, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘নতুন যুগের চীন থেকে ২৪টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদারত্বে’ উন্নীত করা এবং পররাষ্ট্র-প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যায়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ কাঠামো অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত মিলিয়ে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের সূচনা হলো।
দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পর বাংলাদেশই দ্বিতীয় দেশ, যার সঙ্গে চীন ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের’ এই সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ফ্রেম গ্রহণ করল।
কূটনীতিতে শব্দ কখনো নিরীহ নয়; আমাদেরকে ডিপ্লোম্যাটিক ল্যাঙ্গুয়েজের বিটুইন দ্য লাইন পড়তে হবে। অর্থাৎ শি জিনপিংয়ের দুটি বাক্য এবং তার ভেতর-পাঠ আছে।
গ্রেট হলে শি জিনপিং দুটি কথা বলেছেন, যা চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক ভাষ্যেই নথিভুক্ত। সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ‘China-Bangladesh community with a shared future’ আখ্যা দিয়ে।
১। ‘বিশ্ব যতই বদলাক না কেন, চীন-বাংলাদেশ মৈত্রীর মূল অভিমুখে চীন অবিচল থাকবে।’
২। ‘জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা সমুন্নত রাখা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানে চীন বাংলাদেশকে সমর্থন করে।’
কূটনৈতিক ভাষায় ‘টেরিটোরিয়াল ইন্টেগ্রিটি’ ও ‘ফরেন ইন্টারফেয়ারেন্স’ শব্দ দুটি রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ে উচ্চারিত হলে তা নিছক সৌজন্য থাকে না বরং তা হয়ে ওঠে ঘোষিত অবস্থান।
এর ভেতর-পাঠ স্পষ্ট, বাংলাদেশের মানচিত্র নিয়ে কোনো পরাশক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে চীন নিজের কৌশলগত স্বার্থের ওপর আঘাত হিসেবেই দেখবে।
ফলে ভারতের নতুন সংসদ ভবনে ‘অখণ্ড ভারত’ ম্যুরাল ঘিরে প্রতিবেশী দেশগুলোতে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, কিংবা ভারতীয় কোনো কোনো রাজনীতিকের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত সম্প্রসারণবাদী বয়ান এসবের প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের এই ভাষা ঢাকার জন্য একটি কৌশলগত রক্ষাকবচের ঘোষণা।
তুলনাটা আমরা শেখ হাসিনার সফরের সাথে করতে পারি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেইজিং গিয়েছিলেন সফর একদিন আগেই কাটছাঁট, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রত্যাশার চেয়ে সংক্ষিপ্ত বৈঠক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সাক্ষাৎ না করা, আর পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঋণ-প্রত্যাশার বিপরীতে মাত্র ১০০ কোটি ইউয়ানের অনুদান। ঢাকায় ফিরে ১৩ জুলাই হাসিনা নিজেই বলেছিলেন, চীন তিস্তা প্রকল্পে আগ্রহী হলেও ‘ভূরাজনৈতিক বিবেচনায়’ প্রকল্পটি ভারতকে দেওয়া হচ্ছে।
বেইজিংয়ের শীতল প্রোটোকলের ভেতর-পাঠও তখন স্পষ্ট ছিল।
যে সরকার নিজের পররাষ্ট্রনীতি তৃতীয় কোনো রাজধানীর বিবেচনায় সাজায়, তার সঙ্গে কৌশলগত গভীরতায় যাওয়ার কারণ চীনের নেই। হাসিনার সফরে চাইনিজ এনভয় থেকে মেসেজ ছিল পরিস্কার, বাংলাদেশের একটা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও নিজেকে স্যুট করে এমন ডেভেলপমেন্ট পাথ থাকা উচিৎ। খোদ চাইনিজ বিবৃতিতে এমন পরোক্ষ বার্তার উল্লেখ ছিল।
“Xi stressed that China supports Bangladesh in adhering to an independent foreign policy, following a development path that suits its national conditions, safeguarding national sovereignty, independence and territorial integrity, and opposing any external interference.” GlobalTimes, Jul 10, 2024 10:50 PM. (link)
দুই বছরের ব্যবধানে বেইজিং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সোচ্চার হয়েছে। আমি মনে করি এই পরিবর্তনটাই আসল বার্তা।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিই অংশীদারত্বের পূর্বশর্ত, এবং ঢাকা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে শুরু করেছে। এজন্য অর্থনৈতিক করিডোর ও তিস্তা অববাহিকা/জলাধার উন্নয়ন সহ অপরাপর ইকোনোমিক ইনভল্ভমেন্ট গুলোকে এগিয়ে নিয়ে আস্থা বাড়াতে হবে। সময় ক্ষেপণ না করে সমঝোতা স্মারক, চুক্তিগুলোকে বাস্তবায়নে মন দিতে হবে। অর্থাৎ ঢাকাকে ডেলিভারি দেয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তিস্তা অববাহিকা উন্নয়ন প্রকল্প চাইনিজ বেসরকারি কোম্পানি থেকে নদীশাসন ও শহর তৈরি থেকে পরিবর্তিত হয়ে ওয়াটার রিজার্ভার ও নদী ভাঙ্গন রোধ কেন্দ্রিক জিটুজি প্রজেক্টে রুপ নিচ্ছে। বাংলাদেশ ভারতকে আশ্বাস দিতে পারে চীনা প্রকৌশলীরা সীমান্তের ১/২ কিলীমিটারের মধ্যে কাজ করবে না। এর বাইরে এখানে ভারতের কন্সার্ন্ড হবার কিছু নেই।
প্রথমত, বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ।
দ্বিতীয়ত, এ অঞ্চলের যেকোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে অগ্রগতি ভারত স্যাটেলাইট ইমেইজ দিয়েই নজরদারি করে ও করবে।
তৃতীয়ত, এটা সামরিক প্রজেক্ট নয়, ফলে এখানে ভারতের নিরাপত্তাগত কোনো ঝুঁকি আসার প্রশ্ন নাই।
হ্যাঁ, বাংলাদেশকে শুধু একটাই নিশ্চয়তা দিতে হবে ভারতকে। সেটি হচ্ছে, বাংলাদেশ ভারতের নিরাপত্তা সমাধানে আন্তরিক এবং সিকিউরিটি ইস্যু যা ‘ফেইক কল’ নয় তাতে সহযোগিতা অব্যহত রাখবে। এটা বাংলাদেশ আসলেই করে এবং করা উচিৎও। যদিও ভারত এইটাকে জিওপারডাইজ করে। ফলে জিয়াউর রহমান ও প্রফেসর ইউনূসের বার্তা ছিল অভিন্ন। বাংলাদেশকে ডিস্টার্ব করো না, করলে এটা ভারতের সেভেন সিস্টার্সে ছড়িয়ে পড়বে।
তবুও ভারত বাড়াবাড়ি করলে তিস্তার পানি শতভাগ প্রত্যাহারের জন্য, প্রতিবছর ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ক্ষতি ও অবকাঠামগত ক্ষতির জন্য ভারতের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাইতে হতে পারে।এখানে গ্লোবাল সাউথের চীনা ব্লককে কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ, বিষয়টিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমর্থন লাভের জন্য। পাশাপাশি ইউনেস্কো, রামসার কনভেনশন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বায়ো-ডাইভার্সিটি ফোরাম ও কপ তো রয়েছেই।
বাংলাদেশ-চীন অর্থনোইতিক করিডোর খুবই দরকারি প্রজেক্ট। বাংলাদেশের বন্দর গুলোর পণ্য খালাসের গড় সময় ৭ দিন। ফলে ঢাকা থেকে কুনমিং এর সড়ক পথের দূরত্ব যদি ২৪ ঘন্টায় নামিয়ে আনা যায় সেটা বাংলাদেশের আমদানি অর্থনীতি, বিশেষ করে ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি, শিল্পের কাঁচামাল ও ট্রেডিং পণ্যের জন্য হবে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
এখানে বলা বাহুল্য যে, এতে কি ভারত বিরক্ত হবে? অত্যন্ত অযৌক্তিক। বাংলাদেশের সাথে ভারতের ২৪ টি স্থলবন্দর (০২ টি প্রস্তাবিত সহ) আছে। ১৭ টির মত ফাংশনিং, ভারত বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম আমদানি পার্টনার। ফলে দেশের সবচেয়ে বড় পার্টনার চীনের সাথে একটি সরাসরি ইকোনোমিক করিডোর থাকা দেশের ইকোনোমিক লাইফলাইন ও ট্রান্সপোর্টেশনের জন্য অতি উত্তম। এখানে যে বা যারা বাধা দিবে, তারা বাংলাদেশের অর্থনীতির শত্রু বলেই বিবেচিত হবে।
১৯৭৭ এ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চীন সফরে গিয়েছেন। সেখানে চট্রগ্রাম বন্দর উন্নয়ন, এতদসংক্রান্ত অবকাঠামো যেমন ঢাকা-চট্রগ্রাম হাইওয়ে উন্নয়নের ধারণা এসেছে চাইনিজ প্রেসিডেন্ট থেকে। খোদ মাও সেতুং’ও এ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। জিয়া দুটি কাজে মনোনিবেশ করার দেশের অর্থনীতির সক্ষমতা অভূতপূর্ণ বেড়েছে। আজকের নতুন দুটি প্রস্তাবেও দেশের ভাল হবে যদি পরিবেশ সম্মত টেকসই বাস্তবায়ন করা যায়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ২+২’র চীন অভিমূখীতায় ভারতের আপত্তি কিসে? মূলত দিবাস্বপ্ন ভঙ্গ।
অখন্ড ভারত প্রকল্পের নামে বাংলাদেশের রংপুর দখলের দিবা স্বপ্ন মিস্ক্যারেজ করেছে , সার্ভৌমত্ব বিষয়ে চীনের শক্ত অবস্থানে। অর্থনৈতিক প্রকল্পে ভারতের আপত্তি এবং প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে-পরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি, কিংবা ভারতীয় গোদি মিডিয়া দিয়ে ক্রমাগত প্রপ্যাগান্ডা চালানোর ভিন্ন কোনও অর্থ থাকতে পারে না।
প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশের সার্ভৌমত্ব নিয়ে চীনের শক্ত অবস্থানের পরে, বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার দরকার নাই? অবশ্যই আছে।বাংলাদেশের পূর্বমূখী কূটনীতির একটা সামরিক ব্যাখ্যা (ডিপ্লোম্যাসি+ডিফেন্স, ২+২) এমন ছিল যে, বাংলাদেশ কোন ডমিনেন্ট প্রতিবেশী বা ভৌগলিক শত্রু থেকে আক্রান্ত হলে নিজে নূন্যতম ৭ দিনের রেজিস্টেন্স সক্ষমতা তৈরি করবে। এসময়ে দেশটি পূর্বের এলাইদের সক্রিয় করে তাদের এসিস্ট্যান্স ও সাপ্লাই নিশ্চিত করবে। আধুনিক সময়ে সমর কৌশলে ব্যাপকতর পরিবর্তন হয়েছে। এসময়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ও নৌ প্রতিরক্ষার গুরুত্ব বেড়েছে, তাই বাংলাদেশকে এয়ার ডিফেন্স নতুন করে সাজাতে হবে। তবে কনভেনশনাল ডিফেন্স যেহতু খরুচে তাই বাংলাদেশকে রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইরান-ইজ্রায়েল যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে পার্টনার বেইজড কনভেনশনাল এয়ার ডিফেন্স এর পাশাপাশি অত্যন্ত সক্ষম আন-কনভেনশনাল ডিফেন্স বা ড্রোন শিল্পে যেতে হবে।