ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ কাজটা ৫৪ বছরের অপেক্ষার পর একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। আজকে ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও IsDB গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আমরা এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।
প্রকল্পটিতে-
১। সক্ষমতা তিন গুণ: ইস্টার্ন রিফাইনারির crude processing ক্ষমতা বছরে ১৫ লাখ টন থেকে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে। অর্থাৎ অতিরিক্ত ৩০ লাখ টন।
২। ডলার ড্রেইন কমবে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিপিসি প্রায় ৬৮ লাখ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য বিক্রি করেছে, অথচ দেশীয় পরিশোধন সক্ষমতা ছিল ১৫ লাখ টন। বাকিটা এসেছে পরিশোধিত অবস্থায়, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে। সক্ষমতা বাড়লে সেই চাপ কমবে।
৩। জ্বালানি নিরাপত্তা: ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে crude shipment বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে পরিশোধিত তেলের আমদানিনির্ভরতা কমানো নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশয়াশি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।
৪। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা: বিভিন্ন গ্রেডের crude পরিশোধনের সুযোগ তৈরি হবে, এবং ইউরো-৫ মানের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব হবে। ERL ইউনিট-১ এ রশান গ্রেডের ক্রুড পরিশোধন সক্ষমতা নাই।
৫। মূল্য সংযোজন দেশে থাকবে: পরিশোধন, প্রক্রিয়াকরণ ও লজিস্টিকসের মূল্য সংযোজন এতদিন বিদেশে থেকে যাচ্ছিল। এসব ভ্যালু এডিশন দেশে হবে।
প্রকল্পটা ২০১৫ সালে শুরু হয়। feasibility study, project proposal, cost revision, financing negotiation এবং administrative delay ইত্যাদিতে ১৬ বছর লেগেছে। এটা জাতীয় লজ্জার বিষয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সম্প্রসারণের কারিগরি স্পেসিফিকেশন চূড়ান্ত হয় এবং প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। নির্বাচিত সরকার ধারাবাহিকতা রেখে ঋন চুক্তি করেছে। এটি একটি ইতিবাচক নজির। চলমান জ্বালানী সংকটে সরকার বদলালেই ফাইল আটকে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরুনোকে স্বাগত জানাতে হবে।
তবুও প্রশ্নটি থেকে যায়। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও কেন দ্বিতীয় বৃহৎ রাষ্ট্রীয় শোধনাগার হলো না? এই প্রকল্প নিজেই প্রায় ১৬ বছর ধরে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ব্যয় সংশোধন, অর্থায়ন আলোচনা ও প্রশাসনিক বিলম্বের চক্রে ঘুরেছে। আমাদের সমস্যা দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রয়প্রক্রিয়ার অদক্ষতা, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহির ঘাটতি। ঢাকা-চট্রগ্রাম হাইওয়ে, বন্দর রেল, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎসহ জাতীয় সক্ষমতার অপরাপর প্রকল্প গুলোকে এরকম দীর্ঘসূত্রীতা থেকে বের করে আনতে হবে।
এখন অগ্রাধিকার দিতে হবে যাতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করা যায় এবং সময়ক্ষেপণ করে ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ বন্ধ থাকে। আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়নের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সহ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর তারিখকে পরিমাপযোগ্য KPI হিসেবে নির্ধারণ করা।
আরেকটি বিষয়, ১ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন ইতিবাচক, কিন্তু এটি কন্সেশনাল ঋণও নয়। তাই financing cost, পরিশোধ এ যাবার সময়সূচি, প্রকল্পের রিটার্ন এবং প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়। সবকিছুর একটি স্বচ্ছ রিপোর্ট পাবলিকলি/প্রকাশ্যে থাকা দরকার।
ERL-2 কেবল একটি রিফাইনারি প্রকল্প নয়। এটি ডলার সাশ্রয়, জ্বালানি নিরাপত্তা, দেশে মূল্য সংযোজন এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় বাস্তবায়ন সক্ষমতার একটি পরীক্ষা। চুক্তি হয়েছে। এর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে স্বাক্ষরের দিনে নয় বরং রিফাইনারি প্রকৃতপক্ষে চালু হওয়ার ও উৎপাদনের দিনে।