বাব আল-মান্দেব প্রণালী এটি একটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক জলপথ। ভৌগোলিকভাবে এটি একদিকে এশিয়ার ইয়েমেন এবং অন্যদিকে আফ্রিকার জিবুতি ও ইরিত্রিয়া দ্বারা বেষ্টিত। আরবিতে ‘বাব আল-মান্দেব’ শব্দের অর্থ দুর্দশার দুয়ার বা কান্নার ফটক। এর নামকরণের কারণ যেমন এর বিপজ্জনক ভৌগোলিক গঠন, তেমনি এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব।
ঐতিহাসিকভাবে এবং কৌশলগত কারণে এই প্রণালীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনকাল থেকেই এটি পূর্ব আফ্রিকা, আরব এবং ভারতের মধ্যে সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল। ৬ষ্ঠ শতকে আকসুমাইট সাম্রাজ্যের আরব উপদ্বীপে পারাপারের জন্য এটি ব্যবহৃত হতো। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে পর্তুগিজ, উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্য এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এই প্রণালীর ঠিক মাঝখানে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ দখল করে নেয় এবং সেখানে একটি লাইট হাউস স্থাপন করে পুরো সাগরের বাণিজ্যিক পথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর দ্বীপটি দক্ষিণ ইয়েমেনের অংশ হয়।
বর্তমানে ইয়েমেনের ভূখণ্ডে সৌদি যুদ্ধের কারণে ইরান-সমর্থিত হুথি সামরিক বাহিনী এই প্রণালীর তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকা এবং পেরিম দ্বীপের ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে, এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আফ্রিকার জিবুতিতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স ও জাপানের মতো বড় দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
এশিয়া থেকে ইউরোপে সুয়েজ খাল হয়ে যাতায়াতকারী যেকোনো জাহাজকে অবশ্যই প্রথমে বাব আল-মান্দেব প্রণালী পার হতে হয়। এটি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী।
বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত খনিজ তেলের প্রায় ১০% থেকে ১২% (প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৮৮ লক্ষ ব্যারেল) এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। পারস্য উপসাগর থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস পাঠানোর এটি সবচেয়ে দ্রুততম রুট।
এই পথটি ব্যবহার করার ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে জাহাজের যাতায়াতের সময় ১০ থেকে ১৫ দিন বেঁচে যায় (আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে আসার তুলনায়)। এই পথ বন্ধ বা অনিরাপদ হলে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ও জাহাজের ভাড়া বহুগুণ বেড়ে যায়।