জাতীয় বাজেট এক বছরের জন্য একটি আইনও বটে। আমরা জানি যে-কোনো আইন লংঘনের দায়ে শাস্তি আছে। অথচ বাজেটের মতো একটা সুবিশাল ও সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ আইন লংঘনের কারণে সরকারের সংশ্লিষ্ট কারো কোনো সাজা হয় না। আয় কিংবা ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাজেট শতভাগ বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দায়ে সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়ের কাউকেই সাজা তো দূরের কথা, আজতক দায়ীও করা হয়নি।
উপরন্তু আয়-ব্যয়ে ঘাটতি কিংবা মন্ত্রণালয়গুলোর বাড়তি ব্যয় ঘটলে “সম্পূরক বাজেট” পাশের মাধ্যমে সব মাফ করে সাফ-সূতর করে দেয়া হয়। আমরা এই অনিয়মের অপসংস্কৃতির অবসান চাই। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তে বাজেট সংশোধনের নামে অনিয়ম বন্ধ করতে হবে, মার্চের সম্পূরক বাজেট জুনে পাশ করার প্রক্রিয়া থামাতে হবে। যে বাজেট মাঝপথে সংশোধন করতে হয়, তা নিয়ে বাগাড়ম্বর না করে সরকার যেন লজ্জিত হয়, দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। বাজেট-আইনকে আইনের মতোই চলতে দিতে হবে। ধাপ্পাবাজি বাদ দিয়ে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এক বছরের বাজেটকে প্রস্তাব, সংশোধন ও চূড়ান্তকরণের নামে তিন দফায় প্রণয়নের ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে।
গতানুগতিকতার এই ধাপ্পাবাজির বাজেট পরিহার করে অগ্রসর দেশগুলোর মতো অ্যাজুয়াল বাজেট তৈরীতে মনোযোগী হতে হবে। সরকারের দায়-দেনাসহ ব্যালান্স শীট প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবর্তন করতে হবে জুলাই-জুনের অপচয়-মূলক বাজেট-বর্ষও। একীভূত করতে হবে রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট।
গত ৫৫ বছরে এদেশের সরকার ব্যবস্থাকে এতো বড় করা হয়েছে যে, আজ এই বিশাল সরকার জাতির কাঁধে সিন্দাবাদের ভূতের মতো চেপে বসেছে। সাথে দুর্নীতির ভূতও। স্বাধীনতার সময় যেখানে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫টি, সেখানে ৫৫ বছরে তা দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ৫০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। সরকারের সাড়ে ৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা এখন ১৯ লাখে তোলা হয়েছে।
শেখ হাসিনার সরকারই ১৬ বছরে বাড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ পদ-পদবীর সংখ্যা। অথচ সে ডিজিটাল অর্থনীতির যে ধোঁয়া তুলেছিল তাতে কর্মচারী সংখ্যা আরো কমার কথা। কিন্তু তা না করে সরকারে দলীয় লোকদের পুনর্বাসন করতে জাতির কাঁধে যে বিশাল খরচ ও অপচয়ের বোঝা তুলে দিয়েছে, তা এই সরকারও রহস্যজনক কারণে বয়ে চলেছে। যে দেশে মূলত দারিদ্র্য পরিস্থিতির কারণে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশী রাজস্ব আদায় হয় না, সেখানে বিশাল সরকার পুষতে তার পরিচালন ব্যয়ই এখন ৬ লাখ কোটি টাকা। বছরে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা দিতে হচ্ছে ঋণের সুদ।
আরো প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা যাচ্ছে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তার নামে খয়রাতী ব্যবস্থায়। এই খয়রাত দিয়ে আবার দারিদ্র্যের পরিমাণ কম দেখানো হচ্ছে। রাজস্ব আয় থেকে উন্নয়ন তো দূরের কথা, সরকার চালানোর রাজস্ব ব্যয় মেটাতেই নিতে হচ্ছে বিপুল ঋণ। সাথে উন্নয়নের ঋণ ও সুদাসল মিলিয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের ঘাড়ে যে ঋণের দায় চাপানো হচ্ছে, তা থেকে মুক্তি পেতে এদেশের ভবিষ্যতের সম্ভাব্য করদাতা শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম আজ ব্যাপক মাত্রায় দেশত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের সামনে নেই কোনো আলোকিত ভবিষ্যত। তাহলে এদেশের ভবিষ্যত পরিণতি কি শেষ পর্যন্ত দেউলিয়াত্ব? বছর বছর নেয়া এই রাষ্ট্রীয় ঋণের শেষ কোথায়? আমরা অবিলম্বে প্রশাসনিক সংস্কারের ব্যবস্থা করে সরকারের রাজস্ব-ব্যয় কমানোর দাবী জানাই।