ব্যাংকিং খাতের তদারকি ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য ও সক্ষমতা মূল্যায়নের ঐতিহ্যবাহী ‘ক্যামেলস (CAMELS) রেটিং’ পদ্ধতি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারি থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।
ক্যামেলস রেটিংয়ের পরিবর্তে এখন থেকে ব্যাংকগুলোর সার্বিক ঝুঁকি ও ব্যবস্থাপনা মূল্যায়নে চালু করা হয়েছে ‘কম্পোজিট রিস্ক রেটিং’ (সিআরআর) ব্যবস্থা। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কাঠামো বা ‘রিস্ক বেসড সুপারভিশন’ (আরবিএস)-এর একটি অংশ।
অতীতমুখী থেকে ভবিষ্যৎমুখী মূল্যায়ন
এতদিন ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদের গুণগত মান, ব্যবস্থাপনা, আয়, তারল্য এবং বাজার ঝুঁকির সংবেদনশীলতা—এই ছয়টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে অতীত ও বর্তমান আর্থিক অবস্থার মূল্যায়ন বা ক্যামেলস রেটিং করা হতো।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্যামেলস রেটিং ছিল মূলত ‘ব্যাকওয়ার্ড লুকিং’ বা অতীতভিত্তিক। অর্থাৎ, একটি ব্যাংক গত তিন বা ছয় মাসে কী ব্যবসা করেছে, তার ওপর ভিত্তি করে ১ থেকে ৫ স্কেলে স্কোর দেওয়া হতো। এর ফলে ভবিষ্যতে কোনো ব্যাংক সংকটে পড়ার ঝুঁকি থাকলেও তা আগেভাগে ধরা পড়ত না।
এর বিপরীতে নতুন চালু হওয়া ‘কম্পোজিট রিস্ক রেটিং’ (সিআরআর) হবে ‘ফরওয়ার্ড লুকিং’ বা ভবিষ্যৎমুখী। এটি শুধু বর্তমান আর্থিক অবস্থাই দেখবে না, বরং ভবিষ্যতে ব্যাংকটি কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে এবং তা মোকাবিলার সক্ষমতা আছে কিনা, তা আগাম মূল্যায়ন করবে। যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিগন্যাল’ বা আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যে ক্যামেলস পদ্ধতির পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী ঝুঁকিভিত্তিক রেটিং ব্যবস্থা চালু করেছে। আন্তর্জাতিক এই অভিজ্ঞতার আলোকেই বাংলাদেশ ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নতুন এই তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্গঠন করা হয়েছে। তদারকি ও অভিযোগ-সংক্রান্ত কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করে ১৭টি নতুন ‘ব্যাংক সুপারভিশন বিভাগ’ গঠন করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের চিত্র: ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত দুর্বলতাগুলো সামনে আসতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের ৬০ শতাংশের সমান।
কাগজের রেটিং বনাম বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ
ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ক্যামেলস রেটিং মূলত তার নির্ভরযোগ্যতা হারিয়েছিল। অনেক ব্যাংক খেলাপি ঋণ লুকিয়ে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) না রেখে এবং মূলধন ঘাটতি গোপন করে কৃত্রিমভাবে ভালো ফলাফল দেখাত। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এসব কারসাজির বিষয়ে কঠোর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে বারবার নীতিগত ছাড় দিয়ে আসছিল। ফলে সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোও নিজেদের ভালো হিসেবে জাহির করার সুযোগ পেত।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন ‘কম্পোজিট রিস্ক রেটিং’ কাঠামোটি যথেষ্ট দূরদর্শী ও যুগোপযোগী হলেও এর আসল সাফল্য নির্ভর করবে এর ডিজাইনের চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করার সদিচ্ছার ওপর।