বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, দেশের মানুষ ভালো নেই, দেশও ভালো নেই। জনগণের অধিকার আদায়ে বিরোধী দলকে চৌকিদার ও ভ্যানগার্ডের ভূমিকা পালন করতে হয়। দেশের যেখানেই অসংগতি দেখা যাবে, সেখানেই তারা কথা বলবেন।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে টাঙ্গাইল শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত টাঙ্গাইল জেলার দায়িত্বশীলদের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “বর্তমান সরকার কুরআনের আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে এমন আইন পাস করেছে, যা সুস্পষ্টভাবে কুরআনবিরোধী। এই সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিল, তারা অনির্বাচিত কাউকে ক্ষমতায় বসাবে না। কিন্তু এখন তারা এর উল্টোটা করছে।”
তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সরকারকে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। সংসদের ভেতরে বারবার কথা বলেও কোনো সমাধান না পেয়ে বাধ্য হয়ে রাজপথে নামতে হয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, ‘স্বৈরাচার ফিরে আসবে’ এমন কথা বলে আমাদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।
দেশের অতীতের দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ তুলে আমীরে জামায়াত বলেন, “১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় অনেক মানুষ না খেয়ে মারা গেছেন। তখন রাস্তায় রাস্তায় লাশ পড়ে থাকত। সেই ধরনের একটি পরিস্থিতি পার করে এসেছে এই দেশ।”
তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষের সময় বিএনপি বা জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় ছিল না; বরং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। সেই দুর্ভিক্ষ ও সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক গুম, খুন ও দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও নির্মমতার প্রসঙ্গে আমীরে জামায়াত ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনা স্মরণ করে বলেন, তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে ২৮ অক্টোবর বিকেল ৩টায় বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে পূর্বনির্ধারিত সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সকাল থেকেই সমাবেশের মঞ্চ তৈরির কাজ চলছিল। বেলা ১১টার দিকে লগি-বৈঠা ও অস্ত্রধারীরা জামায়াতের সমাবেশস্থলে হামলা চালায়। হামলাকারীরা বিজয়নগর, তোপখানা রোড ও মুক্তাঙ্গন থেকে পল্টন মোড় হয়ে সমাবেশস্থলে আক্রমণ চালায়। একপর্যায়ে তারা পল্টনের বিভিন্ন গলিতে ঢুকে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়।
আমীরে জামায়াত বলেন, হামলায় একের পর এক জামায়াত ও শিবিরের নেতা-কর্মী আহত হন এবং লগি-বৈঠা দিয়ে হামলা চালিয়ে কয়েকজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং তাদের লাশের ওপর উল্লাস করা হয়।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে আমীরে জামায়াত বলেন, ওই সময়ের পর জনগণ দেশের আমূল সংস্কার চেয়েছিল। কিন্তু সরকার ক্ষমতায় এসে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে। এমনকি গণভোটের রায়ও বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্প খাতে সৃষ্ট সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পের উৎপাদন আরও কমতে থাকলে মালিকদের পক্ষে ব্যাংকঋণ পরিশোধ, কারখানা চালু রাখা এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।” প্রয়োজনে অন্য খাত থেকে কাটছাঁট করে শিল্প খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার আহ্বান জানিয়ে আমীরে জামায়াত বলেন, “মধ্যস্বত্বভোগী, সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির কারণে জনজীবন অতিষ্ঠ।” চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দুর্নীতিতে লাগাম টানা না গেলে সরকারের কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “জনগণ আমাদের কাছে বলে, আপনাদের (সরকারের কাছে) কাছেও নিশ্চয় বলে, দুর্নীতির মাত্রা আগের থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা যদি আমরা লাগাম টেনে ধরতে না পারি, তাহলে যত পরিকল্পনাই আমরা নিই, কোনো পরিকল্পনাই আসলে সফলতার মুখ দেখবে না।”
বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রসঙ্গ তুলে আমীরে জামায়াত বলেন, “প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেছিলেন, চার-পাঁচ মাসে কোনো পরিবর্তন হয়নি, বরং দুর্নীতির প্রবৃদ্ধি হয়েছে।” এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটা আমার কথা নয়, এটা মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম সাহেবের কথা।”
দেশে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প খাতে মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে।
জনগণের দাবি আদায়ে লংমার্চসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন আমীরে জামায়াত। তিনি বলেন, “দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথে থাকব। আমরা জনগণের দাবি আদায় করেই ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ। একদিন জনগণের দাবি পূরণ হবেই।”