এক দুরন্ত স্বপ্নবাজের গল্প, যে নিজেই নিজেকে আগুনে ফেলে আলোর খোঁজে যাত্রা শুরু করেছিল। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার রানাপাশা গ্রামে পৈতৃক শেকড়, কিন্তু জন্ম ঢাকায়, বেড়ে ওঠা নারায়ণগঞ্জে। বাবা কামরুল ইসলাম—একজন গার্মেন্টসের কোয়ালিটি ম্যানেজার, জীবনের প্রায় সব উপার্জন ঢেলে দিয়েছেন সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার পেছনে। মা অসুস্থ, বড় ভাই অর্থাভাবে উচ্চশিক্ষা থামিয়ে কোনোভাবে গ্রাফিক ডিজাইনের কোর্সে ভর্তি হয়েছেন। নাঈম ছিল পরিবারের আশার প্রদীপ, বাবা-মায়ের আদরের ছোট ছেলে। জন্ম ১৩ জানুয়ারি ২০০৭।
সেই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন স্বপ্ন দেখেছিল—আইনজীবী হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, কথায় কথায় বলত, “যদি আমার ভাবনাগুলো শব্দে শব্দে বলে যেতে পারতাম…!” অভাবের তাড়নায় নতুন এলাকায় এসে পরিবার ভাড়া বাসায় উঠেছিল যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে। বাবা অবসরে গেলেও বিশ্রাম পাননি—তাঁর কাছে ছেলেদের স্বপ্নটাই ছিল সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কিন্তু নাঈম শুধু পরিবারের নয়, হয়ে উঠেছিল এই দেশের স্বপ্নও।
২০২৪ সালের জুলাই—সারা দেশ জ্বলছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে। ছাত্ররা রাজপথে, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি সন্ত্রাস আর পুলিশের গুলির মুখে। প্রতিরোধের জন্য গড়ে ওঠে স্পেশাল ওয়াটার সাপোর্ট ইউনিট ও রিমেডি ইউনিট, যার অন্যতম সংগঠক ও কমান্ডার ছিল শহীদ নাঈম। যাত্রাবাড়ীর প্রতিটি অলিগলিতে ছড়িয়ে দিয়েছিল ছোট ছোট ইউনিট, যারা রাজপথে আন্দোলনকারী ভাইবোনদের পানি, স্যালাইন, প্ল্যাকার্ড আর সাহস দিয়ে ফিরিয়ে আনত মৃত্যুর মুখ থেকে।
১৮ জুলাই, আন্দোলনের আগুন তীব্রতর। ঘাতক সরকার পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীদের অস্ত্র দিয়ে রাস্তায় নামায়। নাঈমের নেতৃত্বে ইউনিটগুলো প্রতিরোধে নেমে আসে। তিনি নিজে রাজপথে না থেকে ঘরে ফিরে কখনো বিশ্রাম নেননি। জানালার গ্রিলে বাঁধা জাতীয় পতাকা ছিল তাঁর নীরব সাক্ষী। পরদিন ১৯ জুলাই শুক্রবার। ছুটি থাকায় কলেজ-টিউশন ছিল না। বাবার অসুস্থতার সুযোগে নাঈম জানালার গ্রিল থেকে পতাকাটি খুলে বেরিয়ে যায়। কারণ জানত—পতাকা গ্রিলে না থাকলে বাবা বুঝে যাবেন যে সে আন্দোলনে গেছে।
প্রতিবারের মতো এবারও ফিরে আসার কথা ছিল, কিন্তু ইতিহাস অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত—নাঈম আর ফেরে না। পাড়ার অলিগলি ঘুরে, থানায় খোঁজ নিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসে বাবা-মা। রাত পার করে সকালে আবার বের হন বাবার ছদ্মবেশে, লুঙ্গি পরে ঢাকা মেডিকেলে খুঁজে ফেরেন। সবশেষে হিমঘরে, ঠান্ডা স্টিলের ড্রয়ারের ভেতর মিলল নাঈমের নিথর নিস্তব্ধ দেহ। সেই শরীর, যে শরীর একদিন আন্দোলনের পোস্টার লিখত, পেট্রোল বোমায় জ্বলে যাওয়া ভাইয়ের গায়ে পানি ছিটাত, আজ পিতার কাঁধে নীরব।
২০ জুলাই রাতেই লাশ গ্রামের বাড়ি রানাপাশা পৌঁছে। ২১ জুলাই রবিবার জানাজা শেষে দাফন হয় নিজস্ব কবরস্থানে। বাবার চোখে এখন চিরস্থায়ী অন্ধকার, মায়ের চোখে রক্তের বন্যা। যে শহরে এসে স্বপ্ন বুনেছিলেন তারা, সেই শহর থেকে ফিরে গেলেন শুধুই একটা কফিন হাতে। প্রতিবেশীরা বলেন—নাঈম মাথা নিচু করে হাঁটত, ছোট-বড় সবাইকে সালাম দিত, মসজিদে যেত। কেউ ভাবেনি এই শান্ত ছেলে একদিন হবে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পাওয়া শহীদ। তাঁর রক্তে লেখা হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার শপথ।
তাঁর স্বপ্নে আমরা খুঁজে পাই সাহস। তাঁর মৃত্যু নয়, এক অনন্ত আহ্বান—নতুন বাংলাদেশের সূচনা যেখানে কোনো মা- বাবাকে সন্তান খুঁজে হাসপাতালে হিমঘর ঘুরতে হবে না। শহীদ নাঈম বেঁচে থাকবেন প্রতিটি প্রতিবাদী কণ্ঠে, প্রতিটি পোস্টারে, এবং সেই দিন পর্যন্ত—যেদিন খুনি হাসিনার বিচার ইতিহাসের আদালতে লেখা হবে।