স্বাধীনতার পর বিপ্লবীদের নির্বাসন: দেশ কার, সিদ্ধান্ত নেয় কে?
স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি দেশের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল,যারা জীবন, যৌবন ও স্বপ্ন বাজি রেখে দেশকে মুক্ত করেছে, তাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার পর থেকেই এই ভূখণ্ডে প্রকৃত বিপ্লবীদের জন্য জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে। যারা দেশকে ধারণ করে, দেশকে ভালোবাসে নিঃস্বার্থভাবে, এই দেশ যেন বারবার প্রমাণ করেছে, আসলে তা তাদের জন্য নয়।
স্বাধীনতার ইতিহাসে একের পর এক বিপ্লবীর পরিণতি আমাদের সামনে স্পষ্ট। কারও কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে, কারও বিরুদ্ধে সাজানো হয়েছে মিথ্যা মামলা, কাউকে বাধ্য করা হয়েছে নির্বাসনে যেতে, আবার কাউকে নিঃশেষ করে দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। স্বাধীনতার পর শরিফ ওসমান হাদী এটার পরিণতি যেন এই দীর্ঘ বঞ্চনার সর্বশেষ জ্বলন্ত উদাহরণ,যিনি ছিলেন আপসহীন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ়, এবং দেশি-বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া একজন বিপ্লবী কণ্ঠ।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা সুবিধাভোগী গোষ্ঠী কখনোই বিপ্লবীদের আপন করে নিতে পারেনি। কারণ বিপ্লবীরা প্রশ্ন করে, হিসাব চায়, এবং আপস করতে জানে না। ফলে তাদের বিরুদ্ধে শুরু হয় নানামুখী ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক অপপ্রচার, অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করা এবং সর্বোপরি “রাষ্ট্রবিরোধী” তকমা সেঁটে দেওয়া।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি আধিপত্যের নগ্ন বাস্তবতা। যে শক্তিগুলো এ দেশের নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে, তারা কখনোই স্বাধীনচেতা, আত্মমর্যাদাশীল বিপ্লবী নেতৃত্ব চায় না। তাদের প্রয়োজন অনুগত শাসক, নীরব প্রশাসন এবং প্রশ্নহীন জনসমাজ। বিপ্লবীরা এই সমীকরণ ভেঙে দেয় বলেই তারা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শত্রু।
আজ তাই প্রশ্ন উঠে, স্বাধীনতা কি শুধু পতাকা আর মানচিত্রে সীমাবদ্ধ? নাকি যারা স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ ধারণ করে, তাদের জন্যই স্বাধীনতা সবচেয়ে অনিরাপদ? শরিফ ওসমান হাদীর এই ঘটনা আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, এই দেশে দেশপ্রেম অনেক সময় অপরাধে পরিণত হয়, আর বিপ্লবী হওয়া মানে নিঃসঙ্গ হয়ে যাওয়া।
ইতিহাস সাক্ষী থাকবে, যারা বিপ্লবীদের তাড়িয়েছে, দমন করেছে, তারা সাময়িকভাবে ক্ষমতায় থাকতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই মাটির স্মৃতি, এই জনগণের বিবেক বিপ্লবীদের নামই উচ্চারণ করবে। কারণ দেশ কখনো শাসকদের নয়, দেশ শেষ পর্যন্ত তাদেরই যারা দেশকে হৃদয়ে ধারণ করে।