ঢাকা | ১৭ মার্চ ২০২৬
সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভরাডুবি, সংগঠনগত বিভাজন ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে দেশে বাম রাজনীতি ক্রমেই দুর্বল ও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজধানীর পল্টন-প্রেস ক্লাব কেন্দ্রিক ঢাকা-৮ আসনে বামপন্থি দলগুলোর ভোটের চিত্রই তাদের বর্তমান অবস্থার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এ আসনে কাস্তে ও কাঁচি প্রতীকে মোট ভোট পড়েছে মাত্র ৮শ’। বাংলাদেশের সমাজবাদী দল (মার্কসবাদী) প্রার্থী এএইচএম রফিকুজ্জমান আকন্দ পেয়েছেন ৯৬ ভোট, আর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থী ত্রিদীপ কুমার সাহা পেয়েছেন ৭১৪ ভোট।
শ্রমজীবী অধ্যুষিত গাজীপুর-২ আসনেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে কাঁচি প্রতীকের প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ২৫০ ভোট, আর কাস্তে প্রতীকের প্রার্থী পেয়েছেন ১ হাজার ৩৯৭ ভোট।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ১০ দলীয় বাম জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ ১৪৭টি আসনে অংশ নিয়ে মোট ভোট পেয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার, যা মোট বৈধ ভোটের মাত্র ০.১৭ শতাংশ। জোটের অধিকাংশ প্রার্থী এক হাজার ভোটও পাননি, এমনকি অনেকেই শতকের ঘরেও পৌঁছাতে পারেননি। ফলে প্রায় সব প্রার্থীই জামানত হারিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাম দলগুলোর এই দুর্বলতার পেছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিভাজন, নেতৃত্ব সংকট, আদর্শিক দ্বন্দ্ব এবং বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা। রুশ ও চীনপন্থি মতাদর্শিক বিভক্তি, ব্যক্তি পর্যায়ের দ্বন্দ্ব এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দলগুলোর সংগঠনকে দুর্বল করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাম দলগুলোর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে বড় রাজনৈতিক জোটগুলোর সঙ্গে যুক্ত থেকে স্বকীয় অবস্থান হারিয়েছে। কেউ ক্ষমতার অংশ হয়ে সুবিধা নিয়েছে, আবার কেউ বিরোধী জোটে থেকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। ফলে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশল আধুনিক করতে না পারাও বড় একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শ্রমিক-কৃষকের রাজনীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে বিস্তৃত জনভিত্তি তৈরি করতে পারেনি বাম দলগুলো।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সিপিবি ১.১৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ৫টি আসন পেয়েছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই অবস্থান ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনে দলটির ভোট নেমে এসেছে মাত্র ০.০৮ শতাংশে। একইভাবে বাসদের ভোটের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
রাজনীতি বিশ্লেষক চিররঞ্জন সরকার বলেন, “বাম দলগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সাংগঠনিক বিভাজন। একই আদর্শে বিশ্বাসী হয়েও তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রাজনৈতিক শক্তিকে খণ্ডিত করেছে।”
অন্যদিকে সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হাসান প্রিন্স মনে করেন, বর্তমান নির্বাচন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও দ্বিদলীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাম দলগুলোর ভালো ফল করা কঠিন। তিনি বলেন, “ভোটের রাজনীতিতে আমাদের দুর্বলতা আছে, তবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।”