স্টাফ রিপোর্টার – সায়মুন হাসান / Daily Crisis BD / 09 october 2025
হিদায়াতের পথ …..
হিদায়ত কি রাতারাতি আসে, নাকি ধাপে ধাপে অন্তরের প্রস্তুতির ফল?
এই প্রবন্ধে আলোকপাত করা হয়েছে অন্তরের কোমলতা, নৈতিকতা ও সততার ভূমিকা, যা মানুষকে সত্য ও নেকের পথে পরিচালিত করে।পড়ুন, জানুন কীভাবে ধৈর্য, চর্চা এবং অন্তরের উর্বরতা মিলেই প্রকৃত হিদায়াতের চাবি হয়ে ওঠে।
আমরা সচরাচর মানুষের ভালো – মন্দ নির্ধারণ করি তার নামায, রোযা বা বাহ্যিক ইবাদতের উপর ভিত্তি করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো – এটি কি পূর্ণাঙ্গ মানদণ্ড? নামায – রোযা তো প্রত্যেক মুসলিমের জন্যই ফরয। প্রকৃত ভালো- মন্দ নির্ণয় হয়ে মানুষের আখলাক, সততা, আমানতদারিতা, ন্যায় ও মানবিক গুনাবলির মাধ্যমে।
আমাদের সমাজে একটি ভ্রান্ত ধারনা বহুল প্রচলিত – কেউ যদি যৌবনকাল কাটায় অবহেলা ও গোনাহে, তবে বৃদ্ধ বয়সে বা হজ্জ থেকে ফিরে হঠাৎ করেই সে নেককার ও ন্যয়পরায়ণ হয়ে উঠবে।
বাস্তবে এটি অনেকটাই সেই ফাঁকিবাজ শিক্ষার্থীর মতো,
যে সারা বছর পড়াশোনা না করে পরীক্ষার আগের রাতে সব মুখস্হ করার দিবাস্বপ্ন দেখে। যেমন – এক রাতে সব বিদ্যা অর্জন সম্ভব নয়, তেমনি জীবনের শেষপ্রান্তে হঠাৎ আমূল পরিবর্তনও সহজ নয়।
আসলে মানুষের চরিত্র বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নত হয় না। তবে চল্লিশ বছর বয়স জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এ সময় সচেতন মানুষ তার জীবনপথ পর্যালোচনা করে এবং অনেকেই সৎ পথে ফিরে আসে। এরপর পরিবর্তন ঘটলেও তা বিরল।
নিশ্চিয় আল্লাহর ইচ্ছায় সবকিছু সম্ভব। তিনি চাইলে মুহূর্তেই একটি অন্তর পরিবর্তন করে দিতে পারেন।তবে দুনিয়ার নিয়ম হলো- সবকিছু একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে। হিদায়তও সেই সুন্নাতুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত। যে অন্তর আগে থেকেই
নরম, সত্যনিষ্ঠ ও আলোর জন্য প্রস্তুত, আল্লাহর দিকনির্দেশনা সেখানে দ্রুত প্রভাব বিস্তার করে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) কে নবুওয়াতের পূর্বেই আল্লাহ সত্যবাদী, আমানতদার ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী করেছিলেন। সাহাবীদের জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাহেলী যুগেও তাদের অন্তরে নৈতিকতার বীজ ছিল। কারও অন্তর স্বভাবত কোমল, কারও অন্তরে আবার লুকিয়ে ছিল এই কোমলতা। এজন্য সত্য আহ্বান তাদের অন্তরে দ্রুত প্রতিফলিত হয়েছিল।
অপরদিকে, কিছু মানুষের হৃদয় এতটাই কঠিন যে, কোন উপদেশই তাদের স্পর্শ করে না। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন –
ثم قست قلوبكم من بعد ذلك فهي كالحجاره او اشد قسوه. وان من الحجاره لما يتفجر منه الانهار. وان منها لما يشقق فيخرج منه الماء. وان منها لما يهبط خشيه الله. وما الله بغافل عما تعملون.
অনুবাদ : অতঃপর তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেল, যেন পাথর, বরং তার চেয়েও কঠিন। কারণ, কিছু পাথর থেকে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়, আবার কিছু বিদীর্ণ হয়ে পানি নির্গত হয়। আবার কিছু পাথর আল্লাহর ভয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ে। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে অজ্ঞ নন। (সূরা বাকারা, ৭৪)।
অতএব, হিদায়াত লাভের জন্য কেবল ইচ্ছা করাই যথেষ্ট নয়;বরং অন্তরে কিছু গুণাবলী থাকতে হয়- বিবেকবোধ, নৈতিকতা, সত্যবাদিতা ও হৃদয়ের কোমলতা। এগুলোই সেই উর্বর ভূমি, যেখানে আল্লাহর হিদায়েতের বীজ অঙ্কুরিত হয়।
জাহেলী যুগে মদ বৈধ থাকলেও হযরত আবু বকর (রাযি.) কখনো তা স্পর্শ করেননি। জন্মগতভাবেই সত্যের প্রতি আকর্ষণ তাদের জন্য ঈমান গ্রহণকে সহজ করেছিল।
সুতরাং সত্য হলো- একজন অভ্যাসগত মিথ্যাবাদী রাতারাতি সত্যবাদী হয়ে ওঠে না। সুদের লোভে ডুবে থাকা মানুষ হঠাৎ করে সুদকে হারাম মনে করে না। সততা, হালাল রুজি, অন্যর হক রক্ষা- এসবই দীর্ঘ অনুশীলনের ফল। এটি মূলত ইসলামেরই চর্চা, হোক তা ঈমান সহকারে অথবা প্রাথমিকভাবে ঈমান ছাড়া।
মানুষ বৃদ্ধ বয়সে নামাজ -রোজা বাড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু বান্দার হক আদায়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় পরিবর্তন আসে না। অথচ ইসলামের দাবি হলো- আল্লাহর হক ও বান্দার হক উভয়ই যথাযথভাবে আদায় করা।
ان الله لا يغير ما بقوم حتى يغير وا ما بانفسهم
অনুবাদ : আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের ভেতর যা আছে তা পরিবর্তন করে। (সূরা রাদ- ১১ আয়াত)
রাসূলুল্লাহ (সা.)এরশাদ করেছেন – আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সেটি, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা সামান্য।( সহীহ বুখারী সহীহ মুসলিম)।
অতএব, প্রকৃত হেদায়েত হলো ধাপে ধাপে অর্জিত এক দীর্ঘ অনুশীলন। বাহ্যিক ইবাদত ও ভেতরের আখলাক- উভয় মিলেই একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে ভালো হয়ে ওঠে এবং অন্তরের অবস্থায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে, কে হিদায়াতের জন্য প্রস্তুত, আর কে নয়। আল্লাহই অন্তরের অবস্থা সর্বাধিক জানেন।