ঢাকা | জানুয়ারি ২০২৬
সারা দেশে পুলিশের বিরুদ্ধে প্রায় দেড় হাজার মামলা, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে আন্তর্জাতিক তদন্ত জোরদার
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সরাসরি জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর বিচারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই শেষে পুলিশের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া প্রায় দেড় হাজার মামলার মধ্যে ৩০২টি মামলা নিষ্পত্তির জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সারা দেশের বিভিন্ন থানা ও আদালতে জুলাই গণহত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মোট ১ হাজার ৩৯৩টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলার মধ্য থেকে তদন্ত ও বিচারযোগ্যতা বিবেচনায় ৩০২টি মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি মামলায় ১০ থেকে ৮০ জন পর্যন্ত পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। শিগগিরই এসব মামলার নথিপত্র ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হবে।
ওই কর্মকর্তা জানান, ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরই মামলাগুলো স্থানান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়।
🔎 আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে গণহত্যার চিত্র
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থান দমন করতে গিয়ে সারা দেশে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। নিহতদের একটি বড় অংশ পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান। উদ্বেগজনকভাবে, এর মধ্যে অন্তত ১২–১৩ শতাংশ ছিল শিশু।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ থেকে ২১ জুলাইয়ের মধ্যেই কয়েকশ মানুষ নিহত হন। আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু ১৯ জুলাই একদিনেই নিহত হন ১৪৮ জন, যাদের মধ্যে অন্তত ৪০ জনের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে।
🔫 পুলিশের অস্ত্র ব্যবহার ও সহিংসতা
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পুলিশ শুধু টিয়ারশেল বা রাবার বুলেট নয়, লাইভ বুলেটসহ প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে। বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ দীর্ঘ সময় ধরে নির্বিচারে গুলি চালায়—এমনকি পালিয়ে যাওয়া মানুষদের লক্ষ্য করেও।
সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও রামপুরা ছিল সবচেয়ে রক্তাক্ত এলাকা। মাত্র ২১ দিনে ঢাকাতেই নিহত হন প্রায় ৪২৬ জন। এর মধ্যে অন্তত ৫৭ জন মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
এ সময় সারা দেশে পুলিশ প্রায় ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ড গুলি ছোড়ে, যার মধ্যে শুধু ঢাকায় ব্যবহৃত হয় ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড।
🧠 নির্দেশনা ও ঊর্ধ্বতন ভূমিকা
জাতিসংঘ ও বিবিসির অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, পুলিশের প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ ছিল পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনার ফল। এটি কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়। ফাঁস হওয়া অডিও ও তদন্ত প্রতিবেদনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার সরাসরি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ফাঁস হওয়া এক অডিওতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়—প্রতিবাদীদের যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই গুলি চালাতে হবে।
⚖️ মামলার অগ্রগতি ও বিচার
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে পুলিশের বিভিন্ন স্তরের অন্তত ৬১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে সাবেক আইজিপিও রয়েছেন। এসব মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারাধীন।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন,
“আমরা মূল পরিকল্পনাকারী ও সরাসরি দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য।”
🌍 আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও সরকারের অবস্থান
জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিবেদনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আমলে নিয়ে মামলাগুলো ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন,
“কয়েকশ সদস্যের অপরাধের দায় পুরো পুলিশ বাহিনীর ওপর বর্তায় না। প্রকৃত দোষীদের বিচারের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে দায়মুক্ত করাই সরকারের লক্ষ্য।”