ঢাকা, বাংলাদেশ — ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত গুমের ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের মধ্যে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)-এর অতিরিক্ত উপকমিশনার আহমেদুল ইসলামের নাম উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসেছে। গুম সংক্রান্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারিক মানদণ্ড পূরণ না করেও তিনি ব্যক্তিগত মূল্যায়ন ও সন্দেহের ভিত্তিতে বহু মানুষকে অবৈধভাবে আটক ও গুমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশনের কাছে প্রাপ্ত সাক্ষ্য ও নথিপত্রে দেখা যায়—আহমেদুল ইসলাম নিয়মিতভাবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আইনবহির্ভূতভাবে আটক করতেন এবং দীর্ঘ সময় গোপনে রাখতেন। ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ ছাড়াই সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার করা হতো।
কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সিটিটিসির এডিসি আহমেদুল ইসলাম একাধিক গুমের ঘটনায় জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পাওয়া গেছে। কমিশনের এক সদস্যকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, যাদের আটক করা হয়েছে তারা তার বিবেচনায় ‘সন্ত্রাসী’। মতাদর্শগত অপরাধের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অবৈধ আটককে তিনি নিয়মিত চর্চা হিসেবেই দেখতেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আহমেদুল ইসলাম কমিশনের সামনে স্বীকার করেন—আইনে এ ধরনের আটক অনুমোদিত না থাকায় অবৈধ ব্যবস্থাকেই কার্যকর পথ হিসেবে নেওয়া হতো। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপ তিনি ‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয়’ মনে করতেন।
জোরপূর্বক গুমের পর দায়ের করা বহু মামলা কেন এন্টি-টেররিজম ট্রাইব্যুনালে টেকেনি—এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আহমেদুল ইসলাম বলেন, বিচারিক মানদণ্ডে টেকসই প্রমাণ সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। তবে তিনি দাবি করেন, প্রমাণের এই সীমাবদ্ধতা প্রাথমিক আটকের যৌক্তিকতাকে খাটো করে না।
গ্রহণযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কাউকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, তার ব্যক্তিগত বিচারের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত।
কমিশনের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমের অজুহাতে জোরপূর্বক গুমকে ন্যায্যতা দেওয়ার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। আন্তর্জাতিক আইন জরুরি অবস্থাতেও এমন কর্মকাণ্ডের অনুমতি দেয় না।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, জোরপূর্বক গুম কেবল সীমিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ ছিল না; বরং রাজনৈতিক বিরোধী, সমালোচক এবং বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের দমনের জন্য এটি একটি কাঠামোগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
কমিশনের মতে, ব্যক্তিগত আশ্বাস বা আত্মমূল্যায়ন কখনোই বিচারিক প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না। এতে সন্দেহ ও অপরাধের পার্থক্য বিলুপ্ত হয় এবং অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতার ঝুঁকি বাড়ে।
ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, আহমেদুল ইসলাম ও তার টিম অন্তত ২০ জনের বেশি মানুষকে গুমের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরবর্তীতে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।