রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচন ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নানা বিতর্ক।প্রশাসনের সিদ্ধান্তহীনতা, শিক্ষকদের নীরবতা এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর অস্থির ভূমিকা মিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন—আসলে দায় কার?
২০০৫-০৭ সেশনের প্রাক্তন শিক্ষার্থী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ডেইলি ক্রাইসিসকে বলেন, “আমি একজন ছাত্র হিসেবে বলতে বাধ্য হচ্ছি ৫ই আগষ্ট, ২০২৪ এর স্বাধীনতার পর আমাদের সবচেয়ে বড় চাহিদা ছিল শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংস্কার। অথচ এক বছরেও কোনও কমিশন গঠন হয়নি। ছাত্ররাজনীতি নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার একটি বৈধ প্ল্যাটফর্ম। সেই প্রক্রিয়াটিকেই বারবার ব্যাহত করা হয়েছে।”
এবারের রাকসু নির্বাচনে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার নিয়ে। ঘোষিত তফসিলে দেখা যায়, নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে পারবে না। শুরু থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। তাদের দাবি ছিল, প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে রাকসু নির্বাচন হলে তা শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্ব করবে না। কিন্তু প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবিটি আমলে নেয়নি। এতে ছাত্রদল বিভিন্ন সময়ে লিখিত দাবি জানালেও কর্ণপাত করা হয়নি। ফলে নির্বাচন ঘিরে ধীরে ধীরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
মনোনয়ন দাখিলের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাবি ছাত্রদল হুঁশিয়ারি দেয় যে, প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবে না। তারা প্রশাসনের সঙ্গে বারবার আলোচনার চেষ্টা করলেও ইতিবাচক সাড়া পায়নি। অবশেষে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং এক পর্যায়ে কিছু শিক্ষককের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাই জাতীয়ভাবে আলোচিত হয়ে যায় এবং রাবি ছাত্রদলের কালো অধ্যায়” বলে আখ্যায়িত হয়। তবে ছাত্রদল নেতাদের বক্তব্য, আমরা বারবার শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানিয়েছি। প্রশাসন যদি সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিত, তাহলে কোনও অঘটন ঘটত না। দোষ শুধু ছাত্রদের নয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরও। এ ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন (RUAA) নির্বাচনে একই ধরনের অনিয়ম ও অস্থিরতা দেখা গিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে শিবির সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ সতর্ক করে বলেছিলেন, “যদি প্রশাসন সঠিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে না পারে তবে অহিংস পরিবেশ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবার একই ধরণের ভুল হচ্ছে। প্রশাসন শুরু থেকেই আইনি ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন না করে, শেষ মুহূর্তে চাপের মুখে নড়েচড়ে বসছে। এর ফলে ছাত্র সংগঠনগুলো ক্ষুব্ধ হচ্ছে এবং অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। অনেকে মনে করেন, ছাত্রনেতাদের উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ সমালোচনার যোগ্য হলেও মূল দায় প্রশাসন ও শিক্ষকদের সিদ্ধান্তহীনতা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতায় নিহিত। তাই বলা যায়, রাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি দাবি হিসেবেই উঠে এসেছিল। তবে প্রশাসনের ব্যর্থতা ও ছাত্রনেতাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় যুক্ত হয়েছে।