বাজেট মানে কিছু সংখ্যাতত্ত্বের খেলা নয়। বাজেট কেবলই অ্যাকাউন্টিং নয়। একটি জাতির বাজেটের মূল হচ্ছে- তার দর্শন। বাংলাদেশের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে দারিদ্র্য এবং বৈষম্য নিরসন। আমরা বৈষম্যের পরিসংখ্যান আগেই দিয়েছি। বৈষম্য বাড়লে কি দারিদ্র্য কমে? অথচ এদেশের সরকার গত ৫৫ বছর দরে এই উল্টো বয়ানই দিয়ে চলেছে। আজ এই দেশের দারিদ্র্যের হার কত? জাতীয় সংসদের এমপিরাও তা জানেন না। রাষ্ট্রের দারিদ্র্য মাপার একমাত্র সংস্থা- বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্স বা বিবিএস, যাকে বলা হয় সরকারের মিথ্যা পরিসংখ্যানের খনি, সেই বিবিএস শেখ হাসিনার সর্বশেষ শাসনকালের পর আর এই পরিসংখ্যান অফিসিয়ালি প্রকাশ করেনি। আওয়ামী মিথ্যাচারের সংস্কৃতিতে দারিদ্র্যের সর্বশেষ হার দাবী করা হয়েছিল ১৮ শতাংশ। যদিও অর্থনীতিবিদদের হিসেবে করোনাকালে তা ৪০ শতাংশ ছাড়ায়। সদ্য-বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে গতবছর পরিচালিত পিপিআরসি নামের একটি অর্থনৈতিক থিঙ্কট্যাঙ্কের জরীপে দারিদ্র্যের হার ২৮ শতাংশ বলে প্রকাশ করা হয়। যদিও তা পুরোপুরি সঠিক ছিল না। কারণ এদেশে এখনো দারিদ্র্য মাপা হয় গরু-ছাগলের দারিদ্র্য পরিমাপের ক্যালোরি থিওরিতে। শুধু দিনে ২২শ’ ক্যালোরি খেলেই নাকি চলে। যা আজকের আধুনিক দুনিয়ায় এক হাস্যকর পদ্ধতি। এদেশের মানুষের কি আর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পোশাক, বাসস্থান, কর্মসংস্থান কিছুই লাগে না? বাংলাদেশের সংবিধান এদেশের জনগণকে যেসব অধিকার দিয়েছে, সেই হিসেব কষলে এদেশের ৮০ শতাংশেরও বেশী মানুষ আজ দরিদ্র। অথচ এই দরিদ্রদের নিয়ে সরকার আজ উপহাস করছে। অপমান করছে। দরিদ্রদেরও সরকার বলে “বিত্তবান”। তারা নাকি কর ফাঁকিবাজ। সরকারের পরিসংখ্যান অন্তত তাই বলছে। যদিও এই বিশাল দরিদ্রদের উপর কোনো করই প্রযোজ্য হবার কথা নয়। দারিদ্র্যের এই ভয়ংকর বাস্তবতার কারণেই সরকারের রাজস্ব বিভাগ আজ পর্যন্ত ২ শতাংশের বেশী মানুষের কাছ থেকে আয়কর আদায় করতে পারেনি। এজন্য তারা ৮০ শতাংশ পরোক্ষ কর আদায় করে জুলুমের বাজেট সাজায়। যে কর বস্তুত আজকের সভ্য দুনিয়ায় আবার অচল।
গত করোনাকালের পর থেকেই বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে এবং বাস্তবে শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিতে তা প্রকৃতপক্ষে ৫০/৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলেও সরকার তার স্বীকৃতি না দিয়ে পুরনো ফ্যাসিবাদী কায়দায় এখনো মিথ্যা পরিসংখ্যানের ফুলঝুরি ছড়াচ্ছে। বিগত ১৬ বছরের আওয়ামী দুঃশাসন, দুর্নীতি, অনিয়ম, ব্যাংক লুট, বাজেট লুট, অর্থপাচারের পর দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি বর্তমানে কোথায় আছে, তা সরকারের পরিসংখ্যান বিভাগ সত্যিকারভাবে পরিমাপ করছে না। সরকারেরই আরেক উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা- বিআইডিএস বলেছে, তিন মেয়াদের আওয়ামী শাসনামলে দেশে প্রকৃত গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। তাহলে ওই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি তো মাইনাস ছিল। অপরদিকে এদেশের দারিদ্র্যরেখার ওপরে দেখানো অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষ সব সময় দারিদ্র্যের কালো গহ্বরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। একটু রোগব্যাধি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা মূল্যস্ফীতি তাদের কাবু করে আবার দারিদ্র্য রেখার নীচে ফেলে দেয়। এ যেন সেই পিচ্ছিল বাঁশ বেয়ে বানরের ওঠা-নামার অঙ্ক। বর্তমান সংসদেই প্রধানমন্ত্রীই আওয়ামী আমলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের তথ্য তুলে ধরেছেন। এতো দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচারের পরও যদি আওয়ামী সরকারের রেখে যাওয়া ১৮ শতাংশ দারিদ্র্য আর ৪৬০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি ও ভৌতিকঅর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বয়ান বিএনপি সরকার সঠিক বলে মেনে নেয়, তাহলে এদেশের জনগণ হয়তো শিগগিরই বলবে, “আওয়ামী লীগই তো ভালো ছিল। সার্ফ-এক্সেলের বিজ্ঞাপনের মতো- “দাগ থেকে যদি হয় নতুন কিছু, তাহলে দাগই তো ভালো।’ এই সরকার বিগত আওয়ামী সরকারের দেয়া ১৬ বছরের মিথ্যা পরিসংখ্যানের কোনো সংশোধনের ব্যবস্থা না করেই, তার উপর দাঁড়িয়ে, সেইসব মিথ্যা পরিসংখ্যান মেনে নিয়ে এবার যে বাজেট দিয়েছে তাকে ডাহা জোচ্চুরি ছাড়া আর কি কিছুই বলা যায? আমাদের মনে হয় আওয়ামী স্বৈরাচারকে দুধে-ধোয়া পবিত্রতার বৈধতা দিতেই যেন বিএনপি আজ সরকারে আসীন হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটি গল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। এক ডাকাত তার মৃত্যুশয্যায় ছেলেদের ডাকলো। তারপর তাদের বললো, “বাবারা, সারাজীবন ডাকাতি করেছি, মানুষের ক্ষতি করেছি। কিন্তু আমার মৃত্যুর পর তোমরা এমন কিছু করবে, যাতে লোকে আমাকে ভালো বলে, প্রশংসা করে।’ তারপর সে মারা গেল। এরপর ডাকাতের ছেলেরাও ডাকাত হলো। তারাও বাবার মতো পুরোদস্তুর ডাকাতি শুরু করলো। কিন্তু তারা বাবাকে মহান বানাতে ডাকাতির সাথে আরেকটি বিশেষ কাজ যুক্ত করলো। ডাকাতি করে সব লুটে নেবার পরে তারা ওই বাড়ীটিও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে আসতো। এরপর লোকজন বলাবলি শুরু করলো, আরে এদের বাপই তো ভালো ছিল। ডাকাতি করলেও বাড়ীটাতো অন্তত পোড়াতো না। আজ বিএনপি কি আওয়ামী লীগের তেমন সন্তানের দায় নিলো? তা না হলে কেন তারা লুটপাটের আওয়ামী পরিসংখ্যান বাতিল না করে তার উপর নিজেদের ঝাণ্ডা মেলে ধরছে? মিথ্যা প্রবৃদ্ধির আওয়ামী জিডিপিকে ধারণ করে এখন দিচ্ছে ৫শ’ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি অর্জনের হাস্যকর গল্প। মাথাপিছু ৩ হাজার ডলার আয়ের বানোয়াট তথ্য। এর মানে কি? ৩ হাজার ডলার মানে ৪ সদস্যের একটি পরিবারের বার্ষিক আয় দাঁড়ায় ১২ হাজার মার্কিন ডলার। টাকার অংকে যা প্রায় ১৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাসিক আয় সোয়া লাখ টাকা। এ কি অবিশ্বাস্য তথ্য! এই টাকা কোথায়? এদেশের কত শতাংশ মানুষ মাসে সোয়া লাখ টাকা আয় করেন? ২ শতাংশ? তাহলে মাথাপিছু আয় মানে কি মাথার পেছনে থাকা আয়? যা কিনা দেখা যায় না?
এ প্রসঙ্গে আরেকটি গল্পের কথা বলতে চাই। নাসিরুদ্দিন হোজ্জা একদিন বাজারে গিয়ে দেখেন মাংসের দাম খুব খুব সস্তা হয়ে গেছে। তিনি দু’কেজি মাংস কিনে ছেলেকে দিয়ে বাড়ী পাঠালেন। আর বললেন, তোমার মাকে বলবে ভালো করে রান্না করতে। রাতে বাড়ী ফিরে আমরা সবাই খাবো। অতঃপর হোজ্জার স্ত্রী দুপুরে মাংস রাঁধতে গিয়ে কেমন সিদ্ধ আর ফ্লেবার মিলছে তা পরখ করতে শুরু করলেন। তিনি নিজে এক টুকরা খান এবং ছেলেকেও এক টুকরা দেন। স্বাদে অভিভূত হয়ে এভাবে দুই মায়ে-পুতে খেতে খেতে চুলার উপর থেকেই দু’কেজি মাংস সাবাড় করে ফেললেন। এরপর তাদের হুঁশ ফিরলো। ততক্ষণে সব শেষ। স্বামীর জন্য তো কিছুই রইলো না। অবশেষে হোজ্জার স্ত্রী নতুন বুদ্ধি আঁটলেন। রাতে হোজ্জা খেতে বসে মাংস না পেয়ে প্রশ্ন করলেন, মাংস রাঁধোনি? স্ত্রী উত্তর দিলেন, মাংস তো রেঁধেছিলাম, কিন্তু বাড়ীর বিড়ালটি সব চুরি করে খেয়ে ফেলেছে। হোজ্জা তখন বিড়ালটি ধরে ফেলে দাঁড়িপাল্লায় মেপে দেখলেন তার ওজন ২ কেজি। তখন স্ত্রীকে প্রশ্ন করলেন, এটি যদি বিড়াল হয় তাহলে ২ কেজি মাংস গেল কই? আর এটি যদি মাংস হয় তাহলে বিড়াল গেলো কই? এখন আমাদের প্রশ্ন- জিডিপি যদি ৫শ’ বিলিয়ন আর মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলার হয়, তাহলে তার ট্যাক্স বা কর গেলো কই? আর কর-জিডিপি অনুপাত সাড়ে ৬ শতাংশ হলে, প্রকৃত জিডিপি-ই-বা গেলো কোথায় এবং মাথাপিছু আয়ই-বা কোথায়? সব বানোয়াট।