আজ বিডায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ-সংক্রান্ত পদক্ষেপ নিয়ে বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ও উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়ে ব্রিফিং আয়োজন করা হয়েছে। বিনিয়োগ ভবনে অনুষ্ঠিত এই ব্রিফিংয়ে তিনটি অগ্রাধিকারের নিরিখে বাজেট পর্যালোচনা করা হয়: deregulation, দীর্ঘমেয়াদি কর স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত খাতের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা।
ব্রিফিংয়ে সভাপতিত্ব করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আহসান হাবিব। ব্রিফিংয়ে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, “এই বাজেট নিয়ে আমার কাছে তিনটি বিষয় পরিষ্কার। প্রথমত, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়ে সরকার যে আন্তরিক, এই বাজেট তারই বার্তা দেয়। দ্বিতীয়ত, সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজেটটি বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলোকে কাঠামোগতভাবে প্রতিফলিত করেছে। তৃতীয়ত, এফডিআই আকর্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন অবকাঠামোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যকে এগিয়ে নেবে।”
বিডা ও এনবিআর অবশিষ্ট প্রস্তাবগুলো নিয়ে পরামর্শ বিনিময় অব্যাহত রাখবে এবং বাজেটে ঘোষিত পদক্ষেপগুলোকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিডা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্মকর্তারা যৌথভাবে বাজেট ফলাফল উপস্থাপন করেন, যেখানে দেখা যায় যে বিডার ১৭টি খাতভিত্তিক ও নীতি সুপারিশের মধ্যে ১৪টি, অর্থাৎ ৮২ শতাংশ, সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে। এছাড়া ১৯টি ডিরেগুলেশন সংক্রান্ত সুপারিশের মধ্যে ১২টি, অর্থাৎ ৬৩ শতাংশ, গৃহীত হয়েছে। এসব প্রস্তাব বিডা, এনবিআর ও অন্যান্য বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত চার দফা আন্তঃসংস্থা পরামর্শ এবং একাধিক কারিগরি প্রাক-বাজেট আলোচনার ফলস্বরূপ প্রণীত হয়।
ব্রিফিংয়ে উল্লেখিত প্রধান deregulation সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবসায়িক অনুমোদনের ক্ষেত্রে ১৪ দিনের সেবা মান প্রতিশ্রুতি, নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হলে স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন, বন্ড লাইসেন্সের জন্য তিন বছরের মেয়াদ এবং বন্ডেড সুবিধাসমূহের জন্য বিস্তৃত কার্যপরিধি। বাজেটে অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর কাঠামোর আওতায় দ্রুত শুল্ক ছাড়করণের পরিধিও সম্প্রসারিত হয়েছে এবং শুল্ক ছাড়করণের সময় বেসরকারি পরীক্ষাগারের পরীক্ষার প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে।
মুনাফা প্রত্যাবাসন ও কর প্রশাসনকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মুনাফা ও এনআইটিএ-হিসাব প্রত্যাবাসনের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা, বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই প্রত্যাবাসনের সীমা বৃদ্ধি, বাধ্যতামূলক ইলেকট্রনিক ভ্যাট ফাইলিং, স্বয়ংক্রিয় বিআইএন ইস্যু ও রিফান্ড, এবং নিরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য এক বছরের সময়সীমা। কর নির্ধারণের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে প্রয়োজনীয় প্রাক-জমার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা হয়েছে।
শুল্কমুক্ত আমদানিকৃত উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদিত রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্তও বাজেটে বাতিল করা হয়েছে। মোটরসাইকেল, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বৈচিত্র্যময় পাটজাত পণ্য, হস্তশিল্প ও পুনর্ব্যবহৃত বস্ত্রজাত পণ্যসহ আরও দশটি খাত ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই কাঁচামাল আমদানি করতে পারবে।
বার্ষিক পদক্ষেপের বাইরেও, বাজেট বিভিন্ন বিনিয়োগ শ্রেণির জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে । ব্যক্তিগত আয়করের সীমা ও স্তরসমূহ ২০৩০–৩১ অর্থবছর পর্যন্ত অগ্রিমভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স, জাহাজ নির্মাণ, সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌরবিদ্যুৎ ও স্টার্টআপসহ বিভিন্ন খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর ও ভ্যাট বিধান চালু করা হয়েছে। দেশীয়ভাবে উৎপাদিত তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনের জন্য পর্যায়ক্রমে ১০ বছরের কর অব্যাহতিও প্রদান করা হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস এবং মূল্যবান ধাতু খাত জুড়ে লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা চালু করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে নির্বাচিত যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও শিল্প উপকরণের ওপর হ্রাসকৃত বা শূন্য শুল্ক; স্টার্টআপ অর্থায়নে সহায়তা; রপ্তানিমুখী উৎপাদনের জন্য প্রণোদনা; এবং অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোতে ১০০ শতাংশ বিদেশি মালিকানার সুযোগ।