বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা এবং ছাত্র রাজনীতি বহু দশক ধরে গভীরভাবে জড়িত। দীর্ঘ ইতিহাস থেকে বোঝা যায়, ছাত্ররা শুধুমাত্র শিক্ষার্থী নয়, দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেছে, ছাত্র রাজনীতি শিক্ষার্থীর কল্যাণের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার খেলা এবং দলীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটে ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস সমৃদ্ধ এবং অনেক সময় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব ও আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্র রাজনীতি মূলত ১৯৪৮–১৯৫২ সালের মধ্যে শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে এটি শিক্ষানীতি, ছাত্র অধিকার এবং ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—এই সব সময় ছাত্ররা নেতৃত্ব দিয়েছে। ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসু-এর মতো ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, আবাসিক ও শিক্ষাগত ইস্যুতে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার একটি মাধ্যম হিসেবে কার্যকর ছিল।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত ছাত্র সংসদ প্রায়শই রাজনৈতিক দলের প্রভাব এবং সুবিধাভোগী ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে হুমকিতে ফেলে। শিক্ষার ব্যাঘাত, সহিংসতা, চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া আন্দোলন নেতিবাচক প্রভাবের একটি বাস্তব চিত্র। ছাত্ররা অত্যাচার, কোটার অন্যায় ব্যবহার এবং রাজনৈতিক সুবিধা প্রাপ্তির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে, যা প্রমাণ করে শিক্ষার্থীরা নিজের অধিকার এবং ন্যায়বিচার রক্ষায় কতটা সক্রিয় হতে পারে।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। গত ১৬ই সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. ফরিদ আহমেদ সোবহানী The Daily Campus নামক একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে উল্লেখ করেছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র সংসদ এর আইন নেই, তবুও ব্যক্তিরগতভাবে সে মনে করে ছাত্র সংসদ থাকা উচিত, শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের সমস্যা সমাধান করতে পারবে। তিনি বলেন, যদি ছাত্র সংসদ গঠিত হয়, তবে এটি শুধুমাত্র শিক্ষার্থীর কল্যাণ এবং সমস্যা সমাধানের জন্য, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য নয়।
বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র সংসদ প্রায়শই রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা সাধারণত এই ধরনের রাজনীতি বা নির্বাচনী কাঠামো বিন্দুমাত্র চায়না। কারণ, অধিকাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানদের উচ্চমূল্য দিয়ে শিক্ষার সুযোগ প্রদান করেন। বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর ফি বছরে ৩ থেকে ১২ লাখ টাকার মধ্যে হতে পারে। কোন অভিভাবক চাইবে, এমন পরিবেশে তাদের সন্তান পড়াশোনা করুক যেখানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, নির্বাচনী প্রচারণা বা দলীয় সংঘর্ষের কারণে ক্লাস, পরীক্ষা এবং ল্যাব ব্যাহত হবে?
ছাত্র সংসদ বা নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, হুমকি এবং মানসিক চাপের সম্মুখীন হয়। এতে শিক্ষার মান হ্রাস পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার, চাকরি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নিয়োগকর্তারা সাধারণত স্থিতিশীল, নীতি-নিষ্ঠ ও দ্বন্দ্বমুক্ত শিক্ষার্থীকে প্রাধান্য দেন। বাংলাদেশে প্রাইভেট চাকরির পরীক্ষায় কোন ডিগ্রি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেদাভেদ করা হয় না। সুতরাং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য শিক্ষার পরিবেশকে শান্ত এবং অক্ষত রাখা অপরিহার্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে কিছু সুপ্ত বা আড়ালে রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। কিন্তু সেগুলোকে নির্বাচনের মাধ্যমে উন্মুক্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া শিক্ষার পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অভিভাবকরা চান, তাদের সন্তান শুধু শিক্ষার উন্নয়নের সুযোগ পাক, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বা অস্থিতিশীলতার শিকার নয়। UGC, শিক্ষকদের এবং প্রশাসনের কর্তব্য হলো নিশ্চিত করা যে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নামে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা প্রবেশ করতে না পারে।
শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, শিক্ষার মান এবং একটি শান্তিপূর্ণ একাডেমিক পরিবেশ রক্ষার জন্য শিক্ষার্থী ও প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, সুশৃঙ্খল আলোচনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ উন্নত করতে হবে। Students (Or Student+Faculty) Allaiance/Network থাকলেও এটি শিক্ষার্থীর কল্যাণকে প্রাধান্য দিতে হবে, রাজনীতি নয়। ইতিহাস এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে, শিক্ষার্থীর স্বার্থ এবং ন্যায়বিচারের জন্য এটি একমাত্র কার্যকর পথ। আর সবশেষে, যদি আইন লঙ্ঘন করে কিছু কার্যকরী করতে হয় তাহলে “এমন একটি সিস্টেম বা নীতি তৈরি করেন যেখানে- সকল বাংলাদেশী শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পায় চাকরি থেকে শুরু করে তার ব্যক্তিগত জীবনে; সেখানে সরকারি বেসরকারি ন্যাশনাল, ডিগ্রী, পিএইচডি এসব কোনো বৈষম্য থাকবে না।