আজ শহীদ ওসমান হাদি ভাইয়ের জানাযা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই জানাযা শুধু একজন শহীদের জন্য রবের কাছে সমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বরং এটি পরিণত হয়েছে প্রতিবাদ, ভালোবাসা ও সম্মানের সম্মিলিত প্রকাশে। শহীদের জানাযা এ দেশে বারবার নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের নীরব কিন্তু দৃপ্ত প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠেছে।
ফ্যাসিবাদের শাসনামলে জানাযায় শরিক হওয়াই ছিল এক ধরনের প্রতিবাদ। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাযার আয়োজন সেই সময়ের ভয়াবহ দমন-পীড়নের বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়। তখন আশঙ্কা ছিল—জানাযা শেষ করা যাবে তো? হামলা হবে না তো? আয়োজকদের তুলে নেওয়া হবে না তো? ইসলামের একটি ধর্মীয় অনুসঙ্গ পালন করতেও মানুষকে সাহস সঞ্চয় করতে হয়েছে।
সব ভয় উপেক্ষা করে হাজারো মানুষ সেই জানাযায় অংশ নিয়েছিলেন। মোনাজাত পরিণত হয়েছিল প্রতিবাদের ভাষায়—ঠিক যেমন একসময় মাওলানা ভাসানীর মোনাজাত শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সেই গায়েবানা জানাযা ছিল আধিপত্যবাদ, ছাত্র নির্যাতন এবং ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে এক অনন্য প্রতিবাদী মুহূর্ত।
পরবর্তীতে কার্টুনিস্ট মুশতাক আহমেদের কারাগারে মৃত্যুর ঘটনায় শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে অনুষ্ঠিত জানাযাও হয়ে ওঠে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নামক কালো আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মঞ্চ। সেখানে অংশ নিয়ে মানুষ শুধু শোক নয়, ন্যায়বিচারের দাবিও উচ্চারণ করে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে রংপুরে আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর ১৭ জুলাই রাজু ভাস্কর্যের সামনে গায়েবানা জানাযার ডাক দেওয়া হয়। অরাজনৈতিক কোটা সংস্কারের দাবিতে মানুষকে হত্যার নির্মমতা মেনে নিতে না পেরে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। সেই জানাযায় মুসলমানরা দোয়ায় শরিক হন, নারীরা আহ্বানে সাড়া দেন, আর অমুসলিমরা কফিন মিছিল ও স্লোগানে প্রতিবাদে অংশ নেন—যা এক অনন্য সাম্প্রদায়িক ঐক্যের চিত্র তুলে ধরে।
এর আগের দিন ঢাকা কলেজের কাছে শহীদ শাহনাজের মরদেহ ক্যাম্পাসে আনার চেষ্টা করা হলেও গোয়েন্দা সংস্থার চাপে পরিবার শেষ পর্যন্ত রাজি হয়নি। ঢাকা মেডিকেলের মর্গে মর্গে ছুটেও মরদেহ আনা সম্ভব হয়নি।
১৭ জুলাই আবু সাঈদের গায়েবানা জানাযায় অংশ নিতে রাজু ভাস্কর্যে উপস্থিত হলেও জানাযা শুরুর আগেই একদল পুলিশ আয়োজকদের একজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। গুলি ও টিয়ারশেলের মুখে সেদিন ছাত্ররা জানাযা সম্পন্ন করেন।
সেই জানাযার মিছিল আজও থেমে নেই। শহীদ হাদি ভাইয়ের জানাযায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি আবারও সেই জুলাইয়ের দিনগুলোকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। সংসদ ভবন এলাকা জুড়ে মানুষের ঢল—তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সবাই এসেছে শহীদের ভাগীদার হতে, সংগ্রামের অংশ হতে।
আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আবরার ফাহাদের পথ ধরে শহীদ হাদি ভাইকেও আল্লাহ কবুল করেছেন বলে বিশ্বাস করেন অংশগ্রহণকারীরা। তাদের কণ্ঠে ছিল একটাই দোয়া—আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ ও শহীদ হাদি ভাইয়ের পথে বাংলাদেশের সংগ্রামকে কবুল করুন। আমিন।
আবরার থেকে হাদি: জানাযার মিছিলে অব্যাহত প্রতিবাদের ইতিহাস
Previous Articleবীর উত্তম এ.কে. খন্দকারের মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টার শোকবার্তা
Related Posts
ডেইলিক্রাইসিস বিডি
আপডেটের জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
আমাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের
সর্বশেষ খবর জানতে সাবস্ক্রাইব করুন
Office Address
29, Toyenbee Circular Road (5th Floor),
Dainik Bangla Moore,
Motijheel C/A, Dhaka-1000