আন্দোলন প্রতিবেদন
জুলাই-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে সরকার নানা কর্মসূচি গ্রহণ করলেও ‘নতুন বাংলাদেশ’ ধারণাটি বাস্তবে কতটা নতুন—সে প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। ১ জুলাই থেকে শুরু হয়ে ৮ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত ঘোষিত বর্ষপূর্তি কর্মসূচির শেষ দিনে ‘নতুন বাংলাদেশ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নাগরিক পার্টি (নাপা–এনসিপি) নেতাদের বিরোধিতার মুখে বাতিল হয়। পরে কর্মসূচির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘জুলাই স্মৃতি উদযাপন অনুষ্ঠানমালা’।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে মূলত বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা জোরদার করছে। অথচ অভ্যুত্থানের শুরুতে বাম গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যের ভিত্তিতে একটি গণসরকার গঠন এবং রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তর থেকে ফ্যাসিবাদ নির্মূলের আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক শক্তির সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগে শাসক বুর্জোয়া শ্রেণি ও তৎকালীন ‘বিপ্লবী’ ছাত্র নেতৃত্ব সেই প্রস্তাব উপেক্ষা করে।
১৬ জুলাই আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। তখন বাম-ডান সব রাজনৈতিক শক্তি মাঠে নামে এবং একই সঙ্গে মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সক্রিয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, সাম্রাজ্যবাদ, দেশীয় শাসকশ্রেণি ও সেনাবাহিনীর সমর্থনে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ও তথাকথিত সুশীল ‘তৃতীয় শক্তি’ মিলে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এই প্রক্রিয়ায় ছাত্র নেতৃত্বের একটি অংশ—যারা বর্তমানে এনসিপির নেতৃত্বে—অভ্যুত্থানের গণ-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে।
৮ আগস্ট পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার শপথ নেয় পতিত হাসিনা সরকারের রাষ্ট্রপতি ও সংবিধানের অধীনে থেকেই। শপথ অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ বাদে প্রায় সব বুর্জোয়া দল ও তাদের মিত্র শক্তি উপস্থিত থেকে সরকারকে স্বাগত জানায়। তখনই এই পরিবর্তনকে ‘বিপ্লব’, ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ ও ‘নতুন বাংলাদেশ’ নামে অভিহিত করা হয়।
কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও অভ্যুত্থানের শহীদদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ হয়নি, আহত ও পঙ্গুদের সুচিকিৎসার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, আর কট্টর ফ্যাসিস্টদের বিচারও দৃশ্যমান নয়। আওয়ামী ফ্যাসিবাদীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে দেওয়ার কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং শ্রেণি হিসেবে তাদের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা রয়ে গেছে।
অন্যদিকে সংস্কার বনাম নির্বাচন বিতর্কে সরকার ও বুর্জোয়া দলগুলোর দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। বিএনপি দ্রুত নির্বাচন চাইলেও এনসিপি ও জামায়াত বিচার-সংস্কারের অজুহাতে নির্বাচন বিলম্বিত করতে চায়। কিন্তু এই বিতর্কের কোথাও শ্রমিক, কৃষক, দরিদ্র জনগণ, নারী, আদিবাসী ও নিপীড়িত শ্রেণির মৌলিক দাবি স্থান পায়নি।
সরকার জনজীবনে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, চাঁদাবাজি, নিয়োগ-বাণিজ্য, সিন্ডিকেট ও দুর্নীতি আগের মতোই বহাল। শ্রমিকদের ন্যূনতম জাতীয় মজুরি ঘোষণা হয়নি, কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না, বরং ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন দমন করা হচ্ছে। নারী নির্যাতন, সংখ্যালঘু নিপীড়ন, ‘মব’ সন্ত্রাস ও ধর্মবাদী ফ্যাসিবাদের উত্থানও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে এনসিপি ‘নতুন সংবিধান’, ‘নতুন বন্দোবস্ত’, ‘জুলাই সনদ’—এমন নানা স্লোগান তুলে মাঠে নামলেও সমালোচকরা বলছেন, তারা এখনও সরকারের অংশীদার হয়েই জনগণকে নতুন করে বিভ্রান্ত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী বা নির্বাচিত সরকার—যেই ক্ষমতায় থাকুক—বর্তমান ব্যবস্থার ভেতরে থেকে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়া সম্ভব নয়। ইতিহাস বলছে, ’৭১, ’৭৫ কিংবা ’৯০–এর মতো এবারও পুরোনো ব্যবস্থাকে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অর্থাৎ বোতল বদল হলেও ভেতরের মদ সেই পুরোনোটাই।
এই বাস্তবতায় নিপীড়িত জনগণের মুক্তির পথ হিসেবে সমাজতন্ত্র–কমিউনিজমের লক্ষ্যে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে, শ্রমিক–কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠনের আহ্বান জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
জুলাই-অভ্যুত্থান ও ‘নতুন বাংলাদেশ’: পরিবর্তন নাকি পুরোনো ব্যবস্থার নতুন মোড়ক?
Related Posts
ডেইলিক্রাইসিস বিডি
আপডেটের জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
আমাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের
সর্বশেষ খবর জানতে সাবস্ক্রাইব করুন
Office Address
29, Toyenbee Circular Road (5th Floor),
Dainik Bangla Moore,
Motijheel C/A, Dhaka-1000