সংসদ প্রতিবেদক | ঢাকা জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও মৃত্যুকে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ বা বিচারিক হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম। একইসঙ্গে বিগত ১৭ বছরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার ও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে বর্তমান সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাজেট অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
‘১১ শীর্ষ নেতাকে হত্যার ইতিহাস দেশে আর নেই’
এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, “আমাদের দলের নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, আব্দুল কাদের মোল্লা এবং মীর কাশেম আলীকে অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলা সাজিয়ে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার সাথে যারা যেভাবে জড়িত, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তবেই দেশে প্রকৃত আইনের শাসন কায়েম হবে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শুধু এই পাঁচজনই নন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাস্সিরে কোরআন মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীসহ আরও ৬ জন কেন্দ্রীয় নেতাকে বিনা চিকিৎসায় জেলখানায় হত্যা করা হয়েছে। একটি দলের শীর্ষ ১১ জন নেতাকে এভাবে হত্যার নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে আর নেই দাবি করে তিনি বলেন, “সবচেয়ে বেশি জুলুমের শিকার হয়েছে জামায়াতে ইসলামী।”
বাজেট ও সুদমুক্ত অর্থনীতির প্রস্তাব
প্রস্তাবিত বাজেট প্রসঙ্গে জামায়াত নেতা বলেন, বিশাল আকারের এই বাজেট বাস্তবায়ন করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজস্ব আহরণে অনিশ্চয়তা, ঋণের অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং উন্নয়ন ব্যয় সংকোচন এই বাজেট বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলতে পারে।
দেশকে সুদমুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “দেশে সুদ চলতে পারে না। এর বিকল্প হিসেবে সরকার ইসলামী বন্ড বা ‘সুকুক’-এর মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করতে পারে।” ২০২০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক চালুর পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার সুকুক বন্ড বিতরণ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুকুক ব্যবস্থা জোরদার করলে ধীরে ধীরে দেশ সুদমুক্ত হবে।
পাচারকৃত টাকা ও দুর্নীতি রোধে শপথের আহ্বান
বিগত ১৭ বছরের শ্বেতপত্রের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশ থেকে ২৭ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশ গরিব নয়, সমস্যা হলো ৫৪ বছরে সৎ নেতৃত্বের অভাব। বর্তমান সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, “অতীতের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়, আমরা পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। সামনে যে হবো না, সেই নিশ্চয়তা কে দেবে?”
দুর্নীতি প্রতিরোধে সংসদের ৩৪৮ জন এমপিকে একযোগে ‘দুর্নীতি না করার’ শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশী চারিত্রিক ও নৈতিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় ও দ্বীনি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার তাগিদ দেন।
বরাদ্দ বৈষম্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
জুলাই বিপ্লবের প্রসঙ্গ টেনে এটিএম আজহার দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “জুলাই যুদ্ধের মাধ্যমে নতুন করে দেশ সাজানোর জন্য আমরা এই পর্যায়ে এসেছি। কিন্তু গত চারমাসের কর্মকাণ্ডে দেখলাম, আমরা বিরোধীদলীয় এমপিরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার। বরাদ্দের ক্ষেত্রে ১:১০ বা ১:১৫ পর্যন্ত পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দেওয়া হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ‘সবার আগে বিএনপি’।”
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি সরকারকে অবিলম্বে ‘জুলাই সনদ’ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান। একই সাথে জামায়াত নিষিদ্ধের দাবির সমালোচনা করে তিনি বলেন, “জামায়াত নিষিদ্ধ হলে এই শূন্যস্থান পূরণ করবে কে? আপনারা কি একদলীয় শাসন কায়েম করবেন, নাকি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চাচ্ছেন?” দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে বিলম্বের সমালোচনাও করেন তিনি।
সবশেষে, ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’ সংক্রান্ত সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, নামাজ-রোজা করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে—আল্লাহর দেওয়া এই বিধানের কথাই তারা বলেন, অন্য কিছু নয়। এছাড়া তিনি নিজ নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ, কাঁচা রাস্তা পাকা করা এবং মাদ্রাসা শিক্ষকদের দাবি বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান।