আমি আসলে জানিনা জামাত কী চায়, তবে এটুকু বুঝতে পারি তাদের ১৯৭১ সালের আদর্শ থেকে তারা একটুও বিচ্যুত হয়নি।১৯৭১ সালে তারা ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে। এখনও তারা সার্বভৌম বাংলাদেশের পক্ষে নয়।
১৯৭১ সালে এক দু:সাহসী অভিযানে ফ্লাইট লেফটেন্যন্ট মতিয়ুর রহমান শহীদ হবার পর , মতিউর রহমানকে বিশ্বাসঘাতক তকমা দিয়ে জামাতের মতিউর রহমান নিজামী সংবাদপত্রে যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, ৫৫ বছর পর সেটি কপি করে গর্ব ভরে ডাকসু নির্বাচনে শিবিরের এক প্রার্থী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোষ্ট দিয়েছিলেন। সচেতন জনতার প্রতিবাদে পরে তাকে ক্ষমা চাইতে হয়। যদি কোন কারণে এর প্রতিবাদ না হত, তাহলে এই বিবৃতি কপি হতে হতে বীর শ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে ‘বিশ্বাসঘাতক মতি’ বানিয়ে ছাড়তো। জামাতের এই মেটিকুলাস প্ল্যান শুধুমাত্র জুলাই বিপ্লবের জ্ঞান সম্বল করে বুঝতে গেলে লোটা কম্বল দুইই হারানোর সম্ভাবনা প্রবল।
আমার অনেক ষাটোর্ধ বন্ধুও বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছেন না। কারণ জীবনভর ক্যারিয়ার, সম্পদ,সংসার নিয়ে গলদঘর্ম হতে হতে তারা এতদিন পর অবসরে গিয়ে জনগণের কথা ভাবার অবকাশ পাচ্ছেন। হাসিনার শাসনামলে তারা তারা হয় তোষামোদে, নয় ভয়ে ভয়ে টাকা কড়ি কামানোয় ব্যস্ত ছিলেন।তাদের ব্যস্ত সময়ে মানুষের ভাগ্য যে কত ভাবে কত বার পরিবর্তিত হয়েছে তারা টের পাননি। জামাত যে কতবার কত ছলনায় কত দলের সাথে জোট বেধেছে তারা জানেন না।
তবে জামাত যখনই যাদের সাথে জোট বেধেছে সেই দলটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। জামাত হচ্ছে সেই পরগাছার মত যারা মূল গাছটিকেই খেয়ে ফেলে।
জামাতের কিছু উগ্রবাদী সমর্থক সবসময়ই ছিল। জামাতের স্টুডেন্ট ফ্রন্ট যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজত্ব করত, তখন তাদের রগকাটার শিকার হয়েছে অনেক মানুষ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় তারা শক্তিপ্রদর্শণ শুরু করেছিল, স্থানীয় জনতার প্রতিরোধের মুখে তাদের পিঠটান দিতে হয়।
জামাতের মত ছলনাময়ী আরেকটি মাত্র দল ছিল এদেশে তার নাম শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ।
সেই আওয়ামী লীগের স্টুডেন্ট ফ্রন্ট ছাত্রলীগ এক সময় এদেশের প্রাগ্রসর ছাত্র ফ্রন্টগুলির অন্যতম ছিল। আমার একেক সময় মনে হয় ষাটের দশকে তারা তাদের মূল দলের চেয়ে আদর্শ এবং সামর্থে অগ্রসর ছিল। ৬ দফার আন্দোলন, উনসত্তরের গণ আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক প্রতিরোধে তাদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মত ছাত্র লীগকেও ধ্বংশ করে ফেলেছিল।
ছাত্রলীগের অবস্থা যখন কর্ম বিমুখ নেশার কাঙাল জমিদারদের মত হয়ে গিয়েছিল, তখিন ক্ষয়িষ্ণু ছাত্রলীগের হাত ধরে ক্যাম্পাসগুলিতে শিবির ঢুকেছিল।নিষ্কর্মা জমিদারদের হয়ে যেমন জমিদারি চালাতো জমিদারের কর্মচারি আর লেঠেলরা,তেমনি ভাবে ক্যাম্পাস চলত ছদ্মবেশি শিবিরে ইশারায়। ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের মূল টার্গেট ছিল বিএনপি ও ছাত্রদল। সে কারণে মহল্লা বা ক্যাম্পাস কোথাও তাদের স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল না। ফ্যাসিস্ট পতনের পর ছাত্র দল ক্যাম্পাসগুলিতে সংগঠিত হবার আগেই ছাত্র সংসদ শিবিরের দখলে চলে গেছে।
পুরনো জামাতের কথা যদি বাদও দেই, বাংলাদেশে জামাতের বয়স প্রায় ৪৮ বছর, এই ৪৮ বছরে তাদের সর্বোচ্চ নির্বাচনি সাফল্য ১৮টি আসন (১৯৯১)। জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারি ছাত্রদের মধ্যে যেহেতু জামাতের সমর্থকরাও ছিলেন, তাই জামাত ও তার সমমনারা ভাবছেন ক্ষমতায় যাবার এখনই তাদের সেরা সময়। সরাসরি ভোটে পরাজয়ের ভয়ে তারা একবার PR পদ্ধতির আওয়াজ তুলেছে, নির্বাচনে তাদের পরাজয় নির্ধারিত জেনে নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।