ঢাকা | ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া নিয়ে বিদ্যুৎ খাতে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে নতুন সরকার। নবনিযুক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ পরিস্থিতিকে ‘ফিন্যান্সিয়ালি ব্যাংকরাপ্ট’ উল্লেখ করে বলেছেন, অর্থসংস্থান করে ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ করতে হবে।
চাহিদা বাড়ছে, শঙ্কা গরমে
বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট। চলতি বছরে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি ১৩৬টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও আমদানি সক্ষমতা মিলিয়ে মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট।
২০২৫ সালের ২৩ জুলাই দেশে একদিনে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। তবে সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকট ও অর্থাভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।
পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করীম বিবিসি বাংলাকে জানান, বছরের পর বছর ভর্তুকি ও ঘাটতির ফলে এ বকেয়া জমেছে। সরকারের দেওয়া ভর্তুকি সমন্বয় করেও দেনা কমেনি।
বেসরকারি উৎপাদনকারীদের সংগঠন বিপপা জানিয়েছে, বিলের বকেয়া চার-পাঁচ মাসে নামিয়ে না আনলে অনেক কেন্দ্রের পক্ষে তেল আমদানি করা কঠিন হবে। এলসি খোলার পর তেল দেশে আসতে ৪০-৪৫ দিন সময় লাগে। ইতিমধ্যে তেলের মজুদ কমে এসেছে বলেও দাবি তাদের।
জ্বালানি আমদানিতে ডলার চাপ
বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৮৮ শতাংশ গ্যাস, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরশীল। এর বড় অংশই আমদানি করতে হয়। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি বাড়ছে; কয়লা ও তেল প্রায় পুরোপুরিই আমদানিনির্ভর।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলেন, সব জ্বালানি আমদানি করতে বছরে ১৩–১৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। ক্যাপাসিটি পেমেন্টসহ বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে মোট ব্যয় ২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। কিন্তু ডলার সংস্থানই এখন বড় প্রশ্ন।
তার মতে, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ৫৫ শতাংশ লোড ফ্যাক্টরে চলছে, যা ৮৫ শতাংশে নেওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তবে সেজন্য কয়লা আমদানি বাড়াতে হবে।
তেলভিত্তিক কেন্দ্র নিয়ে বিতর্ক
তেলভিত্তিক কেন্দ্র মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ২৩ শতাংশ। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় ৫ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, তেলভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধ করে কয়লার ব্যবহার বাড়ালে বছরে ২৮–৩০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব। তবে ড. ইজাজ হোসেন বলেন, পিক আওয়ারে তেলভিত্তিক কেন্দ্র ছাড়া চাহিদা সামাল দেওয়া ‘একেবারেই অসম্ভব’।
সরকারের করণীয়
মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, আপাতত রমজান ও সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই অগ্রাধিকার। কিছু বকেয়া পরিশোধ করে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো স্ট্যান্ডবাই রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খোঁজা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস, বিদ্যুতের দাম সমন্বয়, জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য এবং সুশাসন নিশ্চিত না করলে বকেয়া ও ঘাটতির চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।
নতুন সরকার এখন তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়া ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের মধ্যেই ভারসাম্য খুঁজছে।