আওয়ামী সিন্ডিকেটের কবজায় হরিরামপুরের বালুমহাল
রফিকুল ইসলাম, শিবালয় (মানিকগঞ্জ)
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ বালুমহাল ঘিরে তিন দফা দরপত্র প্রক্রিয়ায় সরকারি মূল্য থেকে বহু গুণ কম দরে ইজারা প্রদানের ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ধারাবাহিকভাবে এই বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
প্রতিবেদন
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৪৩১ সালে লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের ইজারার সরকারি মূল্য ছিল ১১ কোটি ১১ লাখ ১১ হাজার ১১১ টাকা। সে সময় ইজারা পায় আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মমতাজ বেগমের ঘনিষ্ঠ এবং জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আবিদ হাসান বিপ্লবের প্রতিষ্ঠান এশিয়ান বিল্ডার্স।
অভিযোগ রয়েছে, ইজারা পাওয়ার পর চুক্তির মাধ্যমে বালুমহালের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় আলী আকবর খান ও আকিবুল হাসান খান পরিবারের কাছে।
পরবর্তী বছর ১৪৩২ সালে বালুমহালের ইজারামূল্য কমে দাঁড়ায় ৫ কোটি ৩২ লাখ ৩২ হাজার ৩২ টাকা। ওই সময় ইজারা পায় ফরিদপুরের মিথিলা এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী স্থানীয়ভাবে যুবলীগ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাকর্মীরা কিছু সময়ের জন্য এর নিয়ন্ত্রণ নেয় বলে দাবি করা হয়। তবে কিছুদিন পর প্রভাব খাটিয়ে আবারও বালুমহালটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে যায় কথিত আলী আকবর খান ও আকিবুল হাসান খানদের সিন্ডিকেটের হাতে।
১৪৩৩ সালে বালুমহালের ইজারা প্রক্রিয়া আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। ওই বছর সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল ৭ কোটি ৪২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০ টাকা। প্রথম দফায় ১৪টি সিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র তিনটি দরপত্র—খান এন্টারপ্রাইজ, সজীব করপোরেশন ও জমিদার এন্টারপ্রাইজ।
অভিযোগ অনুযায়ী, খান এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. বিল্লাল খান এবং সজীব করপোরেশনের মালিক মো. সুরুজ খান—আলী আকবর খান ও আকিবুল হাসিন খানের চাচাতো ভাইয়ের ছেলে। স্থানীয়দের দাবি, পরিবারভিত্তিক এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে।
দরপত্রে প্রথম দফায় সরকারি মূল্যের তুলনায় অনেক কম দর পাওয়ায় তা বাতিল করা হয়। দ্বিতীয় দফায় খান এন্টারপ্রাইজ ২ কোটি ৭০ লাখ, সজীব করপোরেশন ২ কোটি ৩০ লাখ এবং জমিদার এন্টারপ্রাইজ ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রস্তাব দেয়।
তৃতীয় দফায় ৮ এপ্রিল দরপত্র উন্মুক্ত করা হলে সর্বোচ্চ দর আসে ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এতে ইজারা পায় মো. বিল্লাল হোসেনের খান এন্টারপ্রাইজ। বিল্লাল হোসেন আজিমপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলী আকবর খানের ভাতিজা বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, লেছড়াগঞ্জ বালুমহাল ঘুরেফিরে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়ায় একাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ একটি নির্দিষ্ট চক্রের হাতেই থাকছে।
অভিযোগ রয়েছে, আজিমনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলী আকবর খান এবং তার ভাই আকিবুল হাসান খান এই বালুমহাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।
তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিন দফা দরপত্র আহ্বানের পর সর্বোচ্চ দরদাতাকেই ইজারা দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক ও বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, “আমরা তিন দফায় দরপত্র আহ্বান করেছি। তৃতীয়বার সর্বোচ্চ দর ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। তাই তাকেই ইজারা দেওয়া হয়েছে।”