স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকার ভিত্তি। কৃষিকাজ, মৎস্য আহরণ থেকে শুরু করে বন্যাপ্রতিরোধ ও নৌযাত্রা প্রতিটি ক্ষেত্রেই নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে তিস্তার পানি বণ্টনে বৈষম্য এবং বর্ষা-শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহের চরম অস্থিরতা উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
পানি বণ্টন সংকট ও ক্ষতি
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ২০১৪ সালের পর থেকে এ প্রবণতা আরও প্রকট হয়েছে। ফলে কৃষি জমিতে সেচের সংকট তৈরি হয় এবং নদীভাঙন ও বালুচর বৃদ্ধির ফলে কৃষিজ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
বর্ষাকালে আবার উল্টো পরিস্থিতি উজানের পানি ঢল ও নদীর কপাট সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ায় তিস্তায় পানির প্রবাহ অনেক সময় তিন থেকে চার লাখ ঘনফুট (সি.এফ.টি.) অতিক্রম করে। হঠাৎ পানির এই স্রোতে নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়।
স্থানীয় প্রশাসন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, পানির এ অনিয়মিত প্রবাহ ও নদীভাঙনে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়। কৃষি, বসতভিটা, চরাঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সড়ক অবকাঠামোসহ বহুবিধ ক্ষেত্রে এই ক্ষতি দৃশ্যমান।
মানুষের জীবন ও জীবিকা
তিস্তা পাড়ের বাসিন্দাদের অনেকেই জানান, নদীর দুই চরম রূপ শুষ্ক মৌসুমের পানি সংকট এবং বর্ষার সময় আকস্মিক বন্যা তাদের জীবনযাত্রাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
স্থানীয় কৃষকরা বলেন, শীতে সেচের পানি না থাকায় রবি মৌসুমে ফসল করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বর্ষায় নদীভাঙনে জমি হারিয়ে অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে প্রায় প্রতি বছরই।
মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু
পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান, নদীশাসন, জলাধার নির্মাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নদীতীর সংরক্ষণের লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বা Teesta River Comprehensive Management Project নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলমান। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য জরিপ, তহবিল ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তত্ত্বাবধানে আগামী জানুয়ারি থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রাথমিক কাজ শুরু করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নদীতীর সংরক্ষণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ মতামত
পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তিস্তার সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনা নীতিতে বাস্তবসম্মত ও ন্যায্য পানিবণ্টন চুক্তি অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি নদীশাসন প্রকল্পে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তিস্তা শুধু একটি নদী নয় এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মূলধারা। মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন যদি সময়মতো এবং সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে বলে আশা প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা। তবে পানি বণ্টন সংকট ও নদী ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাস্তবায়নই হবে এই উদ্যোগের চূড়ান্ত সাফল্যের নির্ধারক।