জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম সংস্কারের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক, কর্মক্ষম ও উদ্ভাবনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার আহ্বান
দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য দরকার। নতুন নির্বাচিত সরকারের উচিত একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রমের পুনর্মূল্যায়ন করা, যাতে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দক্ষ জনবল গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
জাতীয় ঐকমত্য ও শিক্ষার লক্ষ্য
দেশে সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নতি এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্য জাতীয়ভাবে স্বীকৃত। কাজেই শিক্ষা, শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়নে রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাব্যবস্থায় একমত থাকা অত্যাবশ্যক। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এককভাবে শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা গেলে সংস্কারের প্রক্রিয়া সহজ হবে।
শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো পূর্ণাঙ্গ, জ্ঞানসম্পন্ন, দায়িত্বশীল, সৎ ও কর্মক্ষম নাগরিক তৈরি করা, যারা সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবতার কল্যাণে অবদান রাখতে সক্ষম। এই লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক পার্থক্য কোনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে না।
স্থায়ী শিক্ষা কমিশনের প্রয়োজনীয়তা
নতুন সরকারের উচিত হবে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করা। কমিশনটি খ্যাতনামা শিক্ষক, গবেষক ও প্রশাসকের নেতৃত্বে শিক্ষাবিষয়ক সংস্কার কার্যক্রম যথাযথ প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস্তবায়ন করবে।
কমিশন জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ ও শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১ পুনর্মূল্যায়ন করবে এবং জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশ ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করবে।
মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষা
- মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা সহজেই কারিগরি শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে।
- সমাপনী পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতি আধুনিকায়ন ও বৈষম্যমুক্ত করতে হবে।
- দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা সম্প্রসারণের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।
- প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল ও উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনের লক্ষ্য রাখতে হবে।
বাজেট ও অবকাঠামো উন্নয়ন
শিক্ষা বাজেটে জিডিপির ন্যূনতম ২.৫% বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং ধাপে ধাপে তা ৪% পর্যায়ে উন্নীত করা উচিত। বরাদ্দের মাধ্যমে:
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও বেতন বৃদ্ধি
- বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন
- শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ
- শিক্ষার্থীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ
- ক্রীড়া ও খেলাধুলার সুযোগ সম্প্রসারণ
আন্তর্জাতিক মান ও ভাষা শিক্ষা
- মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মান যাচাই ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিকীকরণ করতে হবে।
- শিক্ষাব্যবস্থাকে বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বিদেশি ভাষা শিক্ষা (ইংরেজি, আরবি, চীনা) সম্প্রসারণের প্রয়োজন।
নিরাপত্তা ও নারীবান্ধব পরিবেশ
- সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরাপদ ও নিপীড়নমুক্ত হতে হবে।
- নারী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়ন।
- সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তি ও পথশিশুদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা
- শিক্ষাব্যবস্থার মূলধারায় কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ ও ভোকেশনাল কোর্স বৃদ্ধি।
- মাদরাসা শিক্ষায় আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন।
- ২০৪১ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ৫০% নিবন্ধনের লক্ষ্য অর্জন।
শিক্ষক নিয়োগ ও বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার
- শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ এবং প্রশাসনকে বিরাজনীতিকরণমুক্ত করতে হবে।
- সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষক নিয়োগ।
- বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে সরকারি হস্তক্ষেপ কমানো।
- বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ও আইকিউএসি শক্তিশালীকরণ।
- বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত।
- বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন-ভাতা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণ।