দাগি অপরাধীদের আশ্রয়, সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টনে বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক চাপ—সব মিলিয়ে দ্বিপক্ষীয় আস্থার সংকট গভীর হয়েছে
ঢাকা, বাংলাদেশ — ১১ জানুয়ারি ২০২৬
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সহযোগিতার ভিত্তিতে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রশ্নে পারস্পরিক সন্দেহ ঘনীভূত হয়েছে। আশির দশক থেকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভারতীয় ও ভারত-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক পলাতকদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ নিয়মিতভাবে বাংলাদেশি গণমাধ্যম ও সংসদীয় আলোচনায় উঠে এসেছে।
নব্বই ও দুই হাজারের দশকে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের বিষয়টি উত্থাপন করলেও কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তির সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক অনিচ্ছা এই ইস্যুকে ঝুলিয়ে রেখেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ ও পলাতকদের আশ্রয়কে আঞ্চলিক আস্থাহীনতার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশের জনমনে ক্ষোভের আরেকটি বড় উৎস হলো এই উপলব্ধি—ভারত সম্পর্ক রক্ষায় সমতার বদলে ক্ষমতার ভাষা ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। গণতন্ত্র, পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা কিংবা বাণিজ্য ঘাটতির মতো ন্যায্য প্রশ্ন উঠলেই ‘চাপের রাজনীতি’ দৃশ্যমান হয়। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যখন কোনো রাষ্ট্র প্রতিবেশীর সার্বভৌম উদ্বেগ উপেক্ষা করে কৌশলগত সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনমত দ্রুত নেতিবাচক হয়ে ওঠে।
এখানে স্পষ্ট করা জরুরি—বাংলাদেশের জনগণ ভারতবিরোধিতা চর্চা করতে আগ্রহী নয়; তারা চায় ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক। আজ যে ভারতবিরোধী মনোভাব দৃশ্যমান, তা কোনো আকস্মিক আবেগ নয়; বরং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া। এই দায় ভারতের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এই সংকটের পূর্ণ চিত্র পেতে সীমান্ত হত্যা, নদী ও পানিবণ্টন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিষয়গুলো যুক্ত করা জরুরি। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবাধিকার সংকট। বছরের পর বছর বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হলেও কার্যকর জবাবদিহির অভাব জনমনে এই ধারণা পোক্ত করেছে যে, ভারত বাংলাদেশকে সমান সার্বভৌম প্রতিবেশী হিসেবে দেখে না।
পানিবণ্টনের প্রশ্নে তিস্তা, ফেনী ও গঙ্গার মতো নদীগুলোতে একতরফা নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে ভারতীয় গণমাধ্যম ও বিনোদন শিল্পের একচেটিয়া প্রবাহ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে—যা অনেকের কাছে মানসিক ও সাংস্কৃতিক পরাধীনতার অনুভূতি জাগায়।
এই সবকিছু মিলিয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি হয়—দাগি অপরাধীদের আশ্রয়, সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টনে বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক চাপ একই নীতির ভিন্ন প্রকাশ। এটি সমতার নয়, প্রভাব বিস্তারের নীতি। ফলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব কোনো রাজনৈতিক কৌশল নয়; এটি সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।
আজ ভারতের সামনে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। তারা কি ক্ষমতার ভাষায় সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়, নাকি ন্যায়, সম্মান ও জনগণের অনুভূতির ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক নির্মাণ করবে? বাংলাদেশের জনগণ দ্বিতীয় পথটাই প্রত্যাশা করে।
ভয়ের কূটনীতি কখনোই টেকসই নয়। ইতিহাস প্রমাণ করে, যে জাতি শোককে বার্তায় রূপ দিতে পারে, তাকে চেপে রাখা যায় না। শহীদ শরীফ ওসমান হাদির জানাজায় মানুষের ঢল শুধু শোকের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি একটি জাতির আত্মসম্মানবোধের ঘোষণা।
বাংলাদেশ কারো উপনিবেশ নয়, কারো উপগ্রহও নয়। স্বাধীনতা মানে সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা। ভারত যদি এই বাস্তবতা মেনে নেয়, তবে জনগণ থেকে জনগণের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় লেখা সম্ভব। অন্যথায় ইতিহাস তার স্বাভাবিক গতিতেই চলবে।