ঢাকা, বাংলাদেশ — ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
সাম্প্রতিক সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আসন্ন গণভোটে “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্য সমর্থন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নিরপেক্ষতার পরিপন্থি বলে দাবি করছেন। তবে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত ম্যান্ডেট এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে বিচার করলে এই সমালোচনার বাস্তব ভিত্তি নেই।
১. অন্তর্বর্তী সরকারের মূল ম্যান্ডেটই সংস্কার
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেবল দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা বা নির্বাচন আয়োজনের জন্য গঠিত হয়নি। দীর্ঘদিনের শাসনব্যর্থতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জনঅনাস্থার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট গণঅভ্যুত্থানের ফল হিসেবে এই সরকারের জন্ম।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতভাবে এই সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো—
- রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার
- গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা
- নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাঠামো প্রস্তুত করা
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত দেড় বছরে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণদের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপের মাধ্যমে যে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছেন, বর্তমান সংস্কার প্যাকেজ তারই যৌক্তিক পরিণতি। ফলে এই সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
২. অবস্থান নেওয়া গণতন্ত্রবিরোধী নয়
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারপ্রধানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নে নীরব থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়াই গণতান্ত্রিক রীতি।
গণভোটের ক্ষেত্রে বৈধতার মূল মানদণ্ড হলো—
- ভোটাররা স্বাধীনভাবে মত দিতে পারছেন কি না
- বিরোধী পক্ষ সমানভাবে প্রচারণার সুযোগ পাচ্ছে কি না
- পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য কি না
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই শর্তগুলো অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
৩. এই সময়ে নীরবতা নয়, নেতৃত্ব প্রয়োজন
বাংলাদেশের সংস্কার গণভোট কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের শাসনসংকট, প্রতিষ্ঠান ভাঙনের রাজনীতি এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের বিরুদ্ধে একটি কাঠামোগত জবাব।
যে নেতৃত্ব নিজেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছে এবং সমাধানের রূপরেখা দিয়েছে, তাদের জন্য এই মুহূর্তে নীরব থাকা দায়িত্বহীনতার শামিল। সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এখানে পক্ষপাত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ।
৪. আন্তর্জাতিক নজির স্পষ্ট সমর্থন দেয়
বিশ্বের বহু দেশে সরকারপ্রধানরা গুরুত্বপূর্ণ গণভোটে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন, যা কখনো গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হয়নি। উল্লেখযোগ্য উদাহরণ—
- যুক্তরাজ্য (২০১৬): ডেভিড ক্যামেরন ব্রেক্সিট গণভোটে ‘থাকুন’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালান
- স্কটল্যান্ড (২০১৪): অ্যালেক্স স্যালমন্ড স্বাধীনতার পক্ষে সরাসরি নেতৃত্ব দেন
- তুরস্ক (২০১৭): প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে প্রচার করেন
- ফ্রান্স (১৯৬২): শার্ল দ্য গল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তনে গণভোট চান
এই সব ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ন্যস্ত ছিল।
৫. সরকারি প্রচারণা মানেই চাপ প্রয়োগ নয়
সংস্কার বিষয়ে জেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক সম্পৃক্ততার উদ্দেশ্য হলো তথ্যভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করা। ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তি রোধে সরকারের ভূমিকা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে না; বরং ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্তে সহায়তা করে।
৬. উপসংহার
এই সংকটময় সময়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নয়, বরং দ্বিধা ও নীরবতা। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারমূলক ম্যান্ডেট অনুযায়ী “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান—
- গণতান্ত্রিক দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ
- আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ
- ভোটারদের প্রতি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতিফলন
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত জনগণের হাতেই—এটাই গণতন্ত্রের প্রকৃত নিশ্চয়তা।