ছাত্রলীগের কারাবন্দি নেতা সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের মৃ.ত্যুর ঘটনাটি নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনায় মানুষের প্রতিক্রিয়া—নিন্দা, ক্ষোভ ও বেদনা—স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে যে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ সিলেক্টিভ নয়, বরং সার্বজনীন।
এটা সত্য যে বিগত আওয়ামী শাসনামলে এর চেয়েও ভয়াবহ ও নির্মম ঘটনার নজির রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে আজ অবধি সংশ্লিষ্টদের কোনো প্রকাশ্য অনুতাপ আমরা দেখিনি। ফলে বিষয়টা এমন নয় যে সাদ্দামের নিহত স্ত্রী বা সন্তানের প্রতি হঠাৎ করে তাদের অতিরিক্ত দরদ তৈরি হয়েছে। বরং এই ঘটনায় তৈরি হওয়া জনআবেগকে কাজে লাগিয়ে একটি পক্ষ কেবল রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, আরেকটি পক্ষ এই ঘটনার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ও প্রতিবাদকে “ছাত্রলীগের সন্ত্রা.সীদের প্রতি দরদ” হিসেবে ফ্রেমিং করে রাষ্ট্রকে তার কাঠামোগত অমানবিকতার দায় থেকে অব্যাহতি দিতে চাইছে।
দুঃখজনক হলো—এই দুই পক্ষের কেউই বিদ্যমান আইনি কাঠামো সংস্কার করে মা ও শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। বরং সবাই স্থূল রাজনীতিতেই ব্যস্ত।
প্রকৃতপক্ষে, গ্রে.প্তারকৃত ব্যক্তির স্ত্রী ও সন্তানের মৃ.ত্যুর ঘটনাটি আমাদের বিচারিক ব্যবস্থার একটি গভীর শূণ্যতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এটি নিছক আত্মহ.ত্যা, নাকি কাঠামোগত বা পরিকল্পিত হ.ত্যাকাণ্ড—তা তদন্তসাপেক্ষ। তবে একটি নির্মম সত্য অস্বীকার করা যায় না: রাষ্ট্রের একটি আইনি সিদ্ধান্ত একটি নির্ভরশীল পরিবারকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় ঠেলে দিয়েছিল।
বাংলাদেশের বিবাহ আইন অনুযায়ী স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর। বাস্তবে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় অধিকাংশ নারী ও শিশু পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তির ওপর অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে নির্ভরশীল। এই প্রেক্ষাপটে, কোনো বিকল্প সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হঠাৎ গ্রে.প্তার করার অর্থ হলো—সেই পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ করে দেওয়া এবং তাদের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলা। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে মানসিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি এসব পরিস্থিতিতে আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
এখানে মূল প্রশ্নটি হলো—অপরাধীর শাস্তির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (Collateral Damage) হিসেবে যদি নির্দোষ স্ত্রী ও অনাগত সন্তানের জীবন বিপন্ন হয়, তবে সেই বিচার প্রক্রিয়া কি ন্যায়ের সীমা অতিক্রম করে না?
জাতিসংঘের ‘ব্যাংকক রুলস’ (Bangkok Rules), শিশু অধিকার সনদ (CRC) এবং সিডও (CEDAW) অনুযায়ী গর্ভবতী নারী ও শিশুর ক্ষেত্রে গ্রে.প্তার হওয়া উচিত সর্বশেষ বিকল্প। বিশ্বের বহু দেশে এই ধরনের পরিস্থিতিতে ‘নন-কাস্টডিয়াল’ ব্যবস্থা বা বিকল্প নজরদারির বিধান চালু রয়েছে। ইসলামি ফিকহেও গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে শাস্তি স্থগিত রাখার স্পষ্ট নজির আছে—কারণ গর্ভস্থ শিশুর কোনো অপরাধ নেই। তাহলে স্বামীর গ্রে.প্তার যদি গর্ভবতী স্ত্রী ও অনাগত সন্তানকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে, সেখানে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়াই কি অধিক ন্যায়সঙ্গত নয়?
গ্রে.প্তারের পর জামিন বা প্যারোলে মুক্তিকে একমাত্র সমাধান ভাবাও বাস্তবসম্মত নয়। একজন গর্ভবতী নারী বা নবজাতকের মায়ের পক্ষে বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যে স্বামীর জামিনের জন্য দারে দারে ঘোরা, বিভিন্ন জায়গায় অর্থ জোগাড় করা কিংবা হয়রা.নি সহ্য করা—এই দুর্ভোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বাংলাদেশের জটিল পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো অনেক সময় নারীদের জীবনকে এই অবস্থায় আরও বিপর্যস্ত করে দেয়।
একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে আমাদের অবশ্যই কিছু ন্যূনতম সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার হতে হবে। বিশেষ করে—
১) গ্রে.প্তারের আগে অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের (বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশু) ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা।
২) পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি গ্রে.প্তার হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেই পরিবারের জন্য জরুরি সুরক্ষা, ভরণপোষণ সহায়তা ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
৩) শুধু শাস্তিমুখীতা নয়, মানবিকতা ও সংশোধনের সমন্বয়ে বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো।
একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কেবল অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করেই দায়িত্ব শেষ করে না; বরং সেই প্রক্রিয়ায় কোনো নির্দোষ নারী বা শিশু যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই নিশ্চয়তাও দেয়।
আজ যদি এই কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে কথা না বলি, তাহলে আগামীকাল হয়তো আরেকটি পরিবার ঠিক এভাবেই নীরবে নিঃশেষ হয়ে যাবে।
@সামান্তা শারমিন