রাজশাহী, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহীতে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন নারী ভোটাররা। মোট ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি নারী হওয়ায় তাদের মন জয় করতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বাড়ি বাড়ি প্রচারে নেমেছে।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২২ লাখ ৬৩ হাজার ৯৬৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১১ লাখ ২৩ হাজার ৯০৪ জন, নারী ভোটার ১১ লাখ ৪০ হাজার ৩৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ২৫ জন। সংখ্যার বিচারে নারী ভোটাররা পুরুষদের তুলনায় এগিয়ে থাকায় রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলের কেন্দ্রে এখন তারাই।
বরেন্দ্র অঞ্চল, চরাঞ্চল ও জলাশয়ঘেরা ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের এই জেলায় প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কৃষিকাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমানভাবে যুক্ত থাকলেও যাতায়াতে হয়রানি, মজুরি বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আসন্ন নির্বাচনে এসব সমস্যা থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি খুঁজছেন নারী ভোটাররা।
পবা উপজেলার দর্শনপাড়া গ্রামের জুলেখা বেগম বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষিকাজ করতে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এতে দক্ষতা ও আয় দুটোই বাড়বে।
বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির সংকট নিরসন, দোরগোড়ায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের মধ্যেও জোরালো।
শহরের নারী উদ্যোক্তারাও চান নিরাপত্তা ও নীতিগত সহায়তা। উদ্যোক্তা শিউলি রানী বলেন, সরকার পাশে থাকলে নতুন নারী উদ্যোক্তারা আরও এগোতে পারবেন। গুলনাহার বেগম মনে করেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের শিক্ষার আলোয় আনতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি।
মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি গ্রামের কয়েকজন নারী ভোটার জানান, জামায়াতের নারী কর্মীরা নিয়মিত বাড়ি বাড়ি গিয়ে কথা বলছেন। সন্তানদের শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করছেন। তাদের মতে, বিএনপির প্রচার তুলনামূলক কম চোখে পড়ছে।
রাজিয়া সুলতানা নামের আরেক নারী ভোটার বলেন, মহল্লাভিত্তিক জামায়াতের নারী সভাগুলো বেশ সক্রিয়। সেখানে ‘হ্যাঁ’ প্রতীকে ভোট দেওয়ার গুরুত্ব বোঝানো হচ্ছে।
জামায়াতের নারী নেত্রী হোসনেয়ারা হাসু বলেন, নারী ভোটারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন তারা। অন্যদিকে বিএনপির নারী নেত্রী বুলবুলি বেগম দাবি করেন, ধানের শীষের পক্ষেও নারী ভোটারদের সমর্থন রয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেনের মতে, রাজশাহীতে জামায়াত নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে আলাদা সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ঘরোয়া সভা ও সামাজিক-ধর্মীয় ইস্যু গুরুত্ব পাচ্ছে। বিপরীতে বিএনপির নারীভিত্তিক প্রচার তুলনামূলক দুর্বল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিশ্রুতি নয়—নির্বাচনের পর বাস্তবায়নই নারীদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত না হলে নারীর প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এবারের নির্বাচনে নারী ভোটার শুধু সংখ্যা নয়, শক্তি। গ্রাম থেকে শহর—সব শ্রেণির নারীই চাইছেন এমন প্রতিনিধি, যিনি ভোটের পরেও পাশে থাকবেন। ফলে রাজশাহীর নির্বাচনে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—নারী ভোটার কাকে ভরসা করেন।