ড. মোহেল আলী | প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬
বাংলার মুসলমানদের উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসে নানা তত্ত্ব প্রস্তাবিত হয়েছে। ১৮৭২ সালে এডওয়ার্ড টুইট ডাল্টনের “Descriptive Ethnology of Bengal” প্রকাশিত হয়, যেখানে বেভারলির তত্ত্বের সমর্থন জানানো হয়: নিম্নবর্ণের হিন্দুদের থেকে বাংলার মুসলমানদের উৎপত্তি হয়েছে।
আদমশুমারি ও জনসংখ্যা
১৮৮১ ও ১৮৯১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায়, বাংলায় মুসলমানদের সংখ্যা হিন্দুদের চেয়ে বেশি।
- ১৮৮১: মুসলমান ১ কোটি ৭৮ লাখ ৬৩ হাজার ৪১১; হিন্দু ১ কোটি ৭২ লাখ ৪৫ হাজার ১২০
- ১৮৯১: মুসলমান ১ কোটি ৯৫ লাখ ৮২ হাজার ৪৮১; হিন্দু ১ কোটি ৮০ লাখ ৬৮ হাজার ৬৫৫
শুমারিকারীরা মনে করেন, মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ধর্মান্তর। তবে কোনো বাস্তব উদাহরণ নেই, এবং আদমশুমারি ব্যবস্থার উন্নতি ও মুসলমানদের সহযোগিতার কারণে এই পার্থক্য বাস্তবতায় এসেছে।
গবেষক ও তত্ত্বসমর্থকরা
- সিজেও ডনেল (১৮৯১) পরিসংখ্যান থেকে অনুমান করেন, ১৮৭২–১৮৯১ মধ্যে ইসলাম গ্রহণের হার উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় যথাক্রমে ১০০, ২৬২, ১১০ প্রতি ১০,০০০ জনে।
- ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারও এই তত্ত্ব সমর্থন করেন, তিনি উল্লেখ করেন যে দরিদ্র ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর কাছে ইসলাম সমতার বার্তা হিসেবে এসেছে।
তবে এই ধারণার বাস্তবতা সন্দেহজনক, কারণ মুসলমানরা তখন শাসকও ছিলেন না এবং সংগঠিত ধর্মপ্রচারের কার্যক্রম ছিল না।
রিসলির নৃতাত্ত্বিক সংযোজন
১৮৯২ সালে এইচ এইচ রিসলি ‘The Tribes and Castes of Bengal’ গ্রন্থে তত্ত্বটি সুসংগঠিত করে। তিনি বিভিন্ন মানুষের নাসিকার উচ্চতা মাপার পর সিদ্ধান্তে পৌঁছান, বাংলার মুসলমানরা মূলত নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ধর্মান্তরিত।
সমালোচনা ও বিকল্প ব্যাখ্যা
মুর্শিদাবাদের নবাবের দেওয়ান খন্দকার ফজলে রাব্বি এই তত্ত্বের সমালোচনা করেন।
- ১২০৩ থেকে ১৭৬৫ পর্যন্ত বাংলায় ৫৬২ বছর মুসলিম শাসন ছিল।
- শাসকরা বিদেশি বংশোদ্ভূত (আফগান, মোগল, ইরানি, আরব) এবং বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের বসতি স্থাপন করান।
- মুসলিম বসতি স্থাপনের প্রমাণ শহর, গ্রাম, বাজার ও জেলার নাম এবং খাজনামুক্ত জমি।
- যদি নিম্নবর্ণের হিন্দুদের জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণ সত্য হতো, উচ্চবর্ণের মানুষও ধর্মান্তরিত হতেন। বাস্তবে তা হয়নি।
শারীরিক বৈশিষ্ট্য
রাব্বি উল্লেখ করেন, প্রাথমিক মুসলিম বসতকারীদের বৈশিষ্ট্য দীর্ঘমেয়াদি মিশ্রণ, জলবায়ু, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারার কারণে পরিবর্তিত হয়েছে। তবুও আরব ও অনারব বংশোদ্ভূত মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের সঙ্গে সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে।
উপসংহার
খন্দকার রাব্বি বলেন, বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি ও বৈশিষ্ট্য মূলত দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন, রাজনৈতিক শাসন এবং স্বেচ্ছায় ধর্ম গ্রহণের ফলাফল। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ধর্মান্তর-তত্ত্ব অতিরঞ্জিত এবং তাত্ত্বিক ভিত্তিহীন।