ছেলে মুহাম্মদের কৌতূহল সব সময়ই একটু বেশি। এই বয়সে এমন কৌতূহল থাকা অবশ্য ভালোই। আমার প্রিয় শহর ময়মনসিংহে আল্লামা মুহম্মদ মামুনুল হক সাহেব এসেছেন শুনে তার মনে নানা প্রশ্ন জাগল। সে যেকোনো মূল্যে তাঁর সাথে দেখা করবে, কথা বলবে এবং দোয়া নেবে। কেন জানি না, এই প্রজন্মের তরুণদের ভেতরে মামুন সাহেবের প্রতি এক অন্যরকম আগ্রহ কাজ করে। তারা তাঁর ভিডিও দেখে, বক্তৃতা শোনে; বিশেষ করে সত্যের পক্ষে ও অসত্যের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন কণ্ঠস্বর তরুণদের টানে।
মুহাম্মদ কোনোভাবে জেনেছে যে, মাওলানা মামুনুল হকের সাথে আমার একটা সুসম্পর্ক আছে যদিও এর মধ্যে কোনো দলীয় সম্পর্ক নেই। আমি তাঁকে মন থেকে ভালোবাসি। তিনি বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় আলেম এবং একটি বিখ্যাত ইলমি খান্দানের যোগ্য উত্তরসূরি। তা ছাড়া তিনি যখন কারাবন্দী ছিলেন, তখন তাঁর মুক্তির জন্য দেশের অজস্র মানুষ রোজা রেখেছেন, দোয়া করেছেন। মানুষের জীবনে কিছু ভুলত্রুটি থাকতেই পারে, সেটা স্বাভাবিক। আমি একবার এক লেখায় লিখেছিলাম আমার নিজের জীবনের ভুলগুলো গুনতে গেলে সংখ্যাটা ১৭ পার হবে, আরও লিখলে হয়তো ৫০টি ছাড়িয়ে যাবে। সুতরাং, ভালো-মন্দ মিলেই মানুষ।
মুহাম্মদের তীব্র আগ্রহের কারণে গতকাল আমাকে বের হতেই হলো। গতকাল ময়মনসিংহ শহরের কৃষ্ণচূড়া চত্বরে একটি ১১ দলীয় সমাবেশ ছিল, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন আল্লামা মামুনুল হক। মুহাম্মদ আমাকে বলল, “আব্বু, তুমি কি যাবে?” আমি বললাম, “তুমি একা একাই যাও, আমি গাড়িভাড়া দিচ্ছি।” সে ফুচকা, হালিম বা ঠান্ডা কিছু খাওয়ার টাকা নিয়ে কৃষ্ণচূড়া চত্বরের দিকে রওনা হলো। যাওয়ার আগে আমি তাকে একটি কৌশল শিখিয়ে দিয়েছিলাম যে কীভাবে ভিড় ঠেলে স্টেজের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। সে আমার কৌশল মেনে ঠিকই স্টেজের কাছে গিয়ে ভক্তদের ভিড় দেখল এবং কিছুক্ষণ বক্তব্য শুনল।
আমি তাকে না জানিয়ে, প্রধান অতিথির বক্তৃতার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে স্টেজের কাছাকাছি গেলাম। মাওলানা মামুনুল হক সাহেব একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় বক্তা। তিনি যখন মঞ্চে সাহসিকতার সাথে হুংকার দিয়ে বক্তৃতা করেন, তখন মাঝেমধ্যে আমার ভয়ও লাগে! একবার তিনি আনন্দমোহন কলেজ মাঠে বক্তৃতা করেছিলেন, সেটির উপস্থাপক ছিলাম আমি। তাঁর সাথে সেটিই ছিল আমার প্রথম মঞ্চ শেয়ার করা। এরপরও বেশ কয়েকটি মাহফিলে তিনি বক্তা ছিলেন এবং আমি উপস্থাপনা করেছি। কখনো কখনো তার সঙ্গে নতুন বাজার বা চরপাড়ায় বসে কফি কিংবা ফলের জুস খেয়েছি।
মাওলানা মামুনুল হক এখন দেশের অন্যতম শীর্ষ নেতা। সাধারণত যারা শাসনে আছেন, বড় পদে আছেন কিংবা অনেক বড় ব্যক্তিত্ব, আমি তাদের কাছে একটু কমই যাই। কারণ কেউ ভেবে বসতে পারে যে স্বার্থ উদ্ধারের জন্য গিয়েছি। কাউকে ভালোবাসলে নিঃস্বার্থভাবেই ভালোবাসা উচিত। ২০০৫ সালে আমি শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) যিনি সহীহ বুখারী শরীফের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদক—তাঁর কাছ থেকে লেখালেখি জন্য পুরস্কার ও ক্রেস্ট নিয়েছিলাম। সেই ছবি ও ক্রেস্ট এখনো আমার বাসায় সযত্নে সংরক্ষিত আছে। মুহাম্মদের আগ্রহের মূল কারণ এটাও সে জানে তাঁর সুযোগ্য ছেলের মাওলানা মামুনুল হক সাথে আমার সম্পর্ক আছে, তাই সে তাঁর কাছ থেকে দোয়া নিতে চায়।
আমি বিগত তিন দশক ধরে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কিছু মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষা ও দীক্ষার সাথে জড়িত আছি। একবার ক্লাসে ছাত্রীদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তোমাদের দৃষ্টিতে দেশের শ্রেষ্ঠ আলেম কে?” তারা সমস্বরে বলেছিল, “মাওলানা মামুনুল হক।” অবশ্য এখনকার ছাত্রীরা শায়খ আহমাদুল্লাহ কিংবা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারীর কথা বলে, কিন্তু এই প্রজন্মের আগের কোনো আলেমের নাম তারা তেমন জানে না। তারা বিপ্লবী আলেম মুফতি ফজলুল হক আমিনী রাহিমাহুল্লাহ কিংবা খতীব আল্লামা উবায়দুল হক রাহিমাহুল্লাহ সাহেবের নামও হয়তো চেনে না। তবে দেশের শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম এবং অনেক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের যখন জিজ্ঞেস করেছি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ আলেম কে, তখন অনেকেই মাওলানা মামুনুল হকের নাম নিয়েছেন। সুতরাং, মুহাম্মদ যদি তাঁকে দেখতে চায়, তবে সেটা বিশেষ কিছু নয় নয়, বরং একটি ইতিবাচক দিক।
স্মৃতি ও কৌতূহলের সন্ধানে
আসরের নামাজের আগেই মাওলানা মামুনুল হক সাহেব কৃষ্ণচূড়া চত্বরের প্রোগ্রাম শেষ করে বিদায় নিলেন। সাহসী কণ্ঠে প্রধান অতিথির ভাষণ দিলেন। আমি তখন ভিড়ের মধ্যে কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলাম না। যথারীতি মুহাম্মদের সাথে আমার দেখা হলো। সে স্টেজে উঠেছিল। তার মনে রাজনীতি নিয়ে নানা কৌতুহল। রাজনীতি এখন তার প্রিয় ফুটবল খেলার মতোই আকর্ষণীয় মনে হয়। জাতীয় সংসদ এবং সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে তার প্রবল আগ্রহ। সংসদে কে কী বলল, প্রধানমন্ত্রী কী বললেন এসব সে নিয়মিত খোঁজ রাখে। ফুটবলের প্রতি তার এতটাই ঝোঁক যে, একবার সে ঢাকা ও মোহামেডানের ম্যাচ দেখতে ঢাকা গিয়েছিল। হামজা নামের এক ফুটবলারকে দেখার জন্য সে ঢাকার স্টেডিয়ামে টিকিট কেটে খেলা দেখেছে। সেই বয়সে আমিই তাকে যাতায়াত ভাড়া দিয়ে বলেছিলাম, “বায়তুল মোকাররম মসজিদ, বাংলাবাজারের বইয়ের দোকানগুলো দেখে আসবে।” এতে তার খেলা দেখাও হলো এবং বইয়ের সাথে সম্পর্ক হল।
পিতা হিসেবে সন্তানের এমন ছোট ছোট দাবি পূরণ করাটাকে অনেকেই ভালো চোখে দেখেন, আবার অনেকেই হয়তো ভাবেন এটা ঠিক নয়। যথারীতি তার মা-ও আমাকে মাঝে মাঝে বকাঝকা করে যে কেন তাকে ঢাকায় বা রাজনৈতিক সমাবেশে পাঠালাম। আসলে এই প্রজন্মের কৌতূহল কোন কোন বিষয়ে, তা বোঝা দরকার। আমি সাধারণত রাজনৈতিক প্রোগ্রামে কম যাই, তবে রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এবং শেষ মুহূর্তের দৃশ্যপট দেখার জন্য দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করি। নেতাদের সাথে সরাসরি দেখা করার চেষ্টা কমই থাকে।
এরপর আমি মুহাম্মদকে নিয়ে ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইসলামিয়া চরপাড়া মাদ্রাসায় গেলাম। সেখানে গিয়ে মুহতামিম ও শাইখুল হাদিস আল্লামা আনওয়ারুল হক সাহেবের সাথে দেখা করালাম এবং তাঁর কাছ থেকে মুহাম্মদের জন্য দোয়া নিলাম। তিনি মুহাম্মদের মাথায় হাত রেখে পরম স্নেহে দোয়া করলেন। এরপর আমরা বাংলাদেশী ইসলামী রাজনীতির অন্যতম রূপকার আল্লামা আতহার আলী (রহ.) এর কবর জিয়ারত করলাম। জিয়ারত শেষে মুহাম্মদকে তাঁর সম্পর্কে কিছু ধারণা দিলাম, যেন সে মনে রাখতে পারে এ দেশে ইসলামী রাজনীতির ভিত্তি কারা গড়েছিলেন।
কফি হাউজের আড্ডা ও স্মৃতিচারণ
চরপাড়া মাদ্রাসা আসর নামাজ আদায় করে আমি একটি কফি হাউসে গেলাম। আমার মনে হলো, আল্লামা মামুনুল হক সাহেব হয়তো এখানে কফি বা চা খেতে আসতে পারেন। এক সময় আমি তাঁর সাথে এই কফি হাউজে বসে কফি খেয়েছিলাম এবং কিছুক্ষণ গল্প করেছিলাম। এই কফি হাউজে আমার আরেকটি স্মৃতি জড়িয়ে আছে—একবার মধ্যরাতে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডক্টর আ খ ম খালিদ হোসেনের সঙ্গে এখানে বসে কফি ও দই খেয়েছিলাম। তিনি একটি সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলেন যা মুজীব রহমান অনুলিখন করেছিল । চরপাড়ায় মেহমানদারির জন্য ভালো মানের কয়েকটি কফি হাউজ রয়েছে।
আমি মুহাম্মদকে নিয়ে কফি শপে গিয়ে হাজির হলাম। যথারীতি আল্লামা মামুনুল হক সাহেব সেখানে কফিরর টেবিলে ছিলেন। কফির কাপে চুমুক দেওয়ার আগে তিনি ফালুদা খেলেন এবং আমাকেও সেই ফালুদায় শরিক করলেন। এক বাটি ফালুদা আমরা দুজনে মিলে খেলাম। আমার আরেকটি পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল—একবার ঢাকা শহরের গুলশানের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আমরা একসঙ্গে আনারস ও পেয়ারা মাখানো খেয়েছিলাম। আল্লামা মামুনের এই সাদাসিধে রূপ দেখে আমার মনে হয়েছে, এত বড় নেতা হয়েও তিনি কত সহজে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যেতে পারেন। অথচ অনেকেরই ধারণা, তিনি বুঝি গম্ভীর এবং সহজে কারও সাথে মেশেন না। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি যতবার তাঁর সাথে দেখা করেছি, তাঁকে একজন অত্যন্ত জ্ঞানী, চিন্তাশীল এবং জ্ঞানচর্চায় মগ্ন মানুষ হিসেবেই পেয়েছি। তাঁর সাথে আমার বিভিন্ন দেশের গল্প হয়েছে। জীবনে ৮-১০ বার তাঁর সাথে আমার দেখা ও কথা হয়েছে; প্রতিবারই মনে হয়েছে তিনি একজন দূরদর্শী আলেম ও সুবক্তা।
ইসলামী রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি নানা কৌশলে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি যদি আরও উদার হন এবং দেশের সব স্তরের মানুষকে সাথে নিয়ে রাজনীতি করেন, তবে এ দেশের রাজনীতিতে ‘ইসলামীকরণ’ বা খেলাফতের আদর্শ মডেল কায়েম করার জন্য তিনি একজন যোগ্য নেতা হতে পারবেন। শুধু নির্বাচনমুখী রাজনীতি নয়, জাতীয় ব্যক্তিত্ব গঠনেও তিনি বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। একজন আদর্শ নেতার যে গুণাবলী দরকার, তাঁর মাঝে তা বিদ্যমান। তবে তাঁকে জনতার সাথে আরও বেশি মিশতে হবে এবং দেশের চিন্তাশীল তরুণ প্রজন্মকে কাছে টানতে হবে। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সবার সাথে মেশার মানসিকতা তৈরি করতে হবে, যদিও অনেকে হয়তো এটা পছন্দ করবেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুধু কওমি ঘরানা বা আলেম-ওলামাদের নিয়ে রাজনীতি করে জনতার নেতা হওয়া সম্ভব নয়; সত্যিকারের নেতা হতে হলে সর্বস্তরের জনগণের সাথে মিশতেই হবে।
মুফতী মুহম্মাদুল্লাহ এমপি- এর সাথে সাক্ষাৎ
কফি শপেই হঠাৎ দেখা হয়ে গেল নবনির্বাচিত এমপি মুফতী মুহম্মাদুল্লাহর সাথে। এর আগেও তাঁর সাথে একাধিকবার দেখা হয়েছে এবং অনেক স্মৃতি রয়েছে। আমার ধারণা ছিল, অতীতের স্মৃতির কথা তিনি হয়তো ভুলে গেছেন, কিন্তু তিনি ভোলেননি। তিনি জামিয়া ইসলামিয়া চরপাড়া ময়মনসিংহে একজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি যে রাজনীতিতে আসবেন এবং ফুলপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন, তা আগে জানতাম না। এটি অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়। তিনি জনগণের সাথে দারুণভাবে মেশেন এবং এলাকার মানুষ তাঁকে ভীষণ পছন্দ করে। তিনি যদি স্বাধীন ও মুক্তভাবে কাজ করে যেতে পারেন, তবে ফুলপুরবাসী তথা গোটা দেশ উপকৃত হবে।
মুফতী মুহাম্মাদুল্লাহ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের টিকিটে এমপি হয়েছেন। সংসদে তাঁর কয়েকটি বক্তৃতা আমি শুনেছি। তিনি বক্তৃতায় বিএনপির কিছুটা প্রশংসাও করেছেন। কৌশলগত কারণে তিনি এটা করতেই পারেন, তবে নিজের ও নিজের দলের স্বতন্ত্র কথাগুলোও জোরালোভাবে বলতে হবে। তোষামোদি বা ‘তৈলমর্দন’ ভালো জিনিস নয়; যদিও এ দেশে কাজ আদায়ের জন্য অনেক সময় নিয়ম মেনে সীমিত আকারে কৌশলগত কথা বলতে হয়। যেহেতু তিনি বিরোধী দলে আছেন, তাই কৌশলের সাথেই এলাকার উন্নয়নের কাজগুলো করিয়ে নিতে হবে।
মুফতী মুহাম্মাদুল্লাহর মানুষের সাথে সহজে মেশার ক্ষমতা আছে। তাঁর সাথে আমার কিছু টুকটাক কথা হলো এবং বেশ ভালো লাগল। তবে একটা বিষয় তিনি যদি পান খাওয়াটা একটু কমিয়ে দেন, তবে ভালো হয়। অবশ্য আমি তো তাঁকে সরাসরি বলতে পারি না যে আপনি পান কম খাবেন! সংসদ সদস্যদের হয়তো তিনি পানের বাটা এগিয়ে দিয়ে নিজের এলাকার উন্নয়নের স্বার্থ উদ্ধার করবেন। মাঝে মাঝে পান খাওয়া ভালো, তবে সবসময় পান চিবিয়ে কথা বলাটা দেখতে যেমন শোভন দেখায় না, তেমনি স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। মুফতি মুহাম্মাদুল্লাহ যেহেতু চরপাড়া মাদ্রাসার কৃতী ছাত্র ছিলেন, তাই বর্তমান ছাত্রদের সাথে তাঁর একটি আনুষ্ঠানিক পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে ছাত্ররা অনুপ্রাণিত হবে এবং ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সাহস পাবে।
একটি স্মরণীয় বিকেল
চরপাড়ার এই কফি হাউজে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় আমরা আল্লামা মামুনুল হকের সান্নিধ্যে কাটালাম। দেশ, সমাজ ও নানা বিষয়ে টুকটাক আলাপ হলো। সেখানে আমার আরও কয়েকজন প্রিয় মানুষের সাথে দেখা হলো, যেমন মুহতারাম মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন। তাঁর সাথে এটিই ছিল আমার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ, বেশ ভালো লেগেছে। তিনি আগামী দিনের নেতৃত্বের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছেন। দেখা হলো একসময়ের ‘কলমদানী’ পত্রিকার সম্পাদক ও আমার অত্যন্ত প্রিয় ভাই মুফতী সালাউদ্দীন মাসউদের সাথে। আরও অনেকের সাথেই দেখা হলো। সব মিলিয়ে বিকেলটা চমৎকার কাটল।
মূলত মুহাম্মদের তীব্র আগ্রহের কারণেই গতকাল আমার প্রিয় শহরে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে শুরু করে কফি হাউজ পর্যন্ত এক দীর্ঘ ও চমৎকার সময় কাটানোর সুযোগ হলো। গতকালই জামিয়া ইসলামিয়ার হযরত মুহতামিম আল্লামা আনওয়ারুল হক সাহেব পবিত্র হজ পালন করে দেশে ফিরেছেন। তিনি পরম স্নেহে মুহাম্মদের মাথায় হাত রেখে দোয়া করে দিলেন এবং ফুঁ দিলেন। কফি হাউজের বিদায়ের আগে আল্লামা মামুনুল হক মুহাম্মদের মাথায় হাত রেখে দোয়া দিলেন এই চমৎকার মুহূর্তটি নিশ্চিতভাবেই মুহাম্মদের স্মৃতিতে সারাজীবন অম্লান থাকবে।
আমরা আশা করি, মাওলানা মামুনুল হক আগামীতে দেশের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে যাবেন, হয়তো মন্ত্রী বা বিরোধী দলীয় নেতা হবেন। তাঁর পিতা রাজনীতি করেছেন, তাঁর শিক্ষকেরা রাজনীতি করেছেন এবং তিনি নিজেও দীর্ঘ তিন দশক ধরে রাজনীতির মাঠে সক্রিয়। তবে রাজনীতি করতে হলে হতে হবে চরম দূরদর্শী ও কৌশলী। কারণ রাজনীতির ব্যাকরণ ও সমীকরণ সাধারণ নিয়মের চেয়ে ভিন্ন। এখানে আজকের বন্ধু আগামীকালের শত্রু হতে পারে, আবার আজকের শত্রু আগামীকাল বন্ধুতে পরিণত হতে পারে। রাজনীতির এই খেলা অনেকটা ফুটবল খেলার মতোই টার্গেট ঠিক রেখে খেলে যেতে হয়। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল যেকোনো এক পক্ষ জিতবে ঠিকই, কিন্তু যারা রানার্সআপ হয়, তাদের মূল্যও কম নয়।
মুহাম্মদ ফুটবল খেলা পছন্দ করে, কিন্তু হঠাৎ করে এই বয়সে কেন যে তার রাজনীতির দিকে এত আগ্রহ জাগল, তা আমার জানা নেই। আমাদের বাসায় নিয়মিত পত্রিকা রাখা হয়, সে সেখানে নানা খবর পড়ে। সুযোগ পেলে মোবাইল হাতে নিয়েও সে খবরাখবর দেখে। আগে সে শুধু ফুটবল খেলা বা গেম খেলত, আর এখন সংসদ সদস্যদের বক্তব্য ও তর্ক-বিতর্ক দেখে। তবে আমাদের চাওয়া সংসদ যেন কোনো ‘সার্কাসে’ রূপান্তরিত না হয়। সংসদ সদস্যরা যেন জনগণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ও গঠনমূলক কথা বলেন, কারণ দেশের মানুষ এখন সবকিছু খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করে।
বিশেষ করে চব্বিশের (২০২৪) গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের তরুণদের মনে নেতৃত্ব দেওয়ার এবং সংসদে যাওয়ার একটি নতুন প্রবণতা ও আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমরা চাই মেধাবীরা রাজনীতিতে আসুক, তারা একটি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ উপহার দিক এবং ইসলামকে ধারণ করে বিশ্ব রাজনীতির খবর রেখে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাক।
পিতা হিসেবে সন্তান মুহাম্মদকে কিছুটা সময় দিতে পেরে আমার খুব ভালো লাগছে, এটা আমার দায়িত্বও ছিল। সে দীর্ঘদিন ধরে মামুনুল হক সাহেবকে কাছ থেকে দেখতে চাচ্ছিল। বিশেষ করে আর।আল্লামা মামুন সাহেব যখন জেলখানায় ছিলেন, তখন মিডিয়ায় তাঁর নানা দৃশ্য দেখে মুহাম্মদ ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। জেল থেকে মুক্তির পর থেকেই সে বলছিল, সে মাওলানা মামুনুল হককে সরাসরি দেখবে। মূলত কিশোর ও শিশুদের এই নিষ্পাপ কৌতূহল ও আগ্রহই আমাকে গতকাল ঘর থেকে বের হতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
লাবীব আব্দুল্লাহ