নিজস্ব প্রতিবেদক │Daily Crisis BD নেত্রকোনা
১৬ অক্টোবর ২০২৫
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড প্রকাশিত ফলাফলে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার আলহাজ্ব মফিজ উদ্দিন তালুকদার কলেজে এইচএসসি পরীক্ষায় পাশের হার মাত্র ২.৮ শতাংশ, যা জেলার ইতিহাসে অন্যতম সবচেয়ে নিম্ন ফলাফল হিসেবে রেকর্ড হয়েছে।
বোর্ডের অফিসিয়াল ফলাফলশিট (EIIN: 137588) অনুযায়ী, মোট পরীক্ষার্থী ১০৭ জন, এর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৩ জন, ফেল করেছে ১০৪ জন শিক্ষার্থী।
ফলাফলে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত GPA ৪.০০, GPA ৩.০০ থেকে ৩.৫০ পেয়েছে মাত্র ২ জন শিক্ষার্থী, আর বাকি সবাই অকৃতকার্য।
‘শতভাগ পাস’ থেকে ২.৮% এক বছরের ব্যবধানে ভয়াবহ পতন
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পরপর তিনবার নেত্রকোনা জেলার ‘শ্রেষ্ঠ কলেজ’ ও ‘গোল্ডমেডেলপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে পুরস্কার পাওয়া এই কলেজটি অতীতে শতভাগ পাসের নজির স্থাপন করেছিল।
কিন্তু, ২০২৩ সালে নকল ও অনৈতিক সুবিধা প্রদানের একাধিক অভিযোগ ওঠায় ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড পরীক্ষাকেন্দ্র পরিবর্তন করে।
কেন্দ্র পরিবর্তনের পর এবার ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির ফলাফল নেমে আসে ইতিহাসের সবচেয়ে নিচে শতভাগ থেকে মাত্র ২.৮ শতাংশে।
বোর্ডের সরকারি ফলাফল অনুযায়ী
মোট পরীক্ষার্থী: ১০৭ জন
পাশ করেছে: ৩ জন
ফেল করেছে: ১০৪ জন
পাসের হার: ২.৮০%
সর্বোচ্চ GPA: ৪.০০
গ্রুপ: মানবিক ১০৫ জন, ব্যবসায় শিক্ষা ২ জন
ফলাফল প্রকাশের তারিখ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫
পরীক্ষানিয়ন্ত্রক: প্রফেসর সৈয়দ আখতারুজ্জামান
অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ
দীর্ঘদিন ধরে কলেজটির গভর্নিং বডির সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যক্ষ ফারুক আহমেদ তালুকদার এবং তাঁর স্ত্রী, বর্তমান অধ্যক্ষ মোছাঃ কামরুন্নাহার এর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, অবৈধ নিয়োগ, সনদ জালিয়াতি, ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের পরীক্ষায় দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে এই কলেজের শিক্ষার্থীরা “নকলের মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা পেয়েছিল।”
দুর্গাপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বজলুর রহমান আনসারী বলেন,
আমি নিজে ওই কেন্দ্রে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নকল করতে দেখে এক্সপেল করি। এরপরই কিছু লোক আমাকে সরানোর দাবিতে মানববন্ধন করায়।”
তদন্ত চলছে দুদক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে
ফলাফল প্রকাশের পর স্থানীয়দের ক্ষোভ চরমে উঠেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বর্তমানে কলেজটির বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা করছেন নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবু তাহের।
পূর্বেও তদন্ত হলেও রাজনৈতিক তদবির ও প্রভাবের কারণে অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তে ছিলেন বলে জানা গেছে।
জেলা প্রশাসকের মন্তব্য
নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামান বলেন,
একটি কলেজ যা পরপর তিনবার শ্রেষ্ঠ কলেজের পদক পেয়েছে, হঠাৎ এত ভয়াবহ ফলাফলে স্পষ্ট বোঝা যায় অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা রয়েছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।”
উপসংহার
শিক্ষার নামে অনিয়ম, কেন্দ্রভিত্তিক অনৈতিক সুবিধা ও রাজনৈতিক তদবিরের কারণে দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
আলহাজ্ব মফিজ উদ্দিন তালুকদার কলেজের এই ফলাফল শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং একটি শিক্ষা ব্যবস্থার পতনের প্রতিচ্ছবি হয়ে দেখা দিয়েছে।
স্বচ্ছ তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহিতার দাবিতে স্থানীয় সচেতন মহল ও শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই সোচ্চার।
[ফলাফল যাচাইকৃত উৎস: ময়মনসিংহ বোর্ড অফিসিয়াল ইনস্টিটিউশন রেজাল্টশিট, প্রকাশের তারিখ ১৬ অক্টোবর ২০২৫]