Daily Crisis BD
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা | ১৮ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে ঘোষিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ এমন এক অঙ্গীকারনামা প্রকাশ পেয়েছে যা একই সঙ্গে আশা ও আশঙ্কা—দুটোকেই উস্কে দিয়েছে। সনদে একদিকে ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টের গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে আইনগত দায়মুক্তি প্রদানের ধারা—এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানকে পাশাপাশি রাখা হয়েছে।
এই বৈপরীত্যই এখন জাতির আলোচনার কেন্দ্রে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের অনেকেই মনে করছেন, এই দ্বৈত ধারা ভবিষ্যতে দেশে নতুন রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।
বিচারের অঙ্গীকার: জনগণের প্রত্যাশা
২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্টে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানে শত শত নাগরিক, ছাত্র, ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য প্রাণ হারান। সেই সময়ের ঘটনাগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক মোড় ঘুরিয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের পতনে রূপ নেয়।
অন্তর্বর্তী সরকার তখন থেকেই ঘোষণা দিয়ে আসছিল—‘জুলাইয়ের রক্ত বৃথা যাবে না’। সেই ধারাবাহিকতায় “হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে” এই প্রতিশ্রুতি জনগণের কাছে ন্যায়বিচারের আশার প্রতীক হয়ে ওঠে।
কিন্তু একই সনদে যখন দায়মুক্তির বিষয়টি যুক্ত হয়, তখন সেই আশায় ফাটল ধরেছে।
দায়মুক্তি ধারা: শান্তির বার্তা না ন্যায়বিচারের বাধা?
সনদের দ্বিতীয় ভাগে উল্লেখ রয়েছে—“অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা; অতীতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রতিরোধ করতে আইনগত দায়মুক্তি প্রদান করা হবে”।
এই বক্তব্যকে কেউ কেউ সমঝোতার রাজনীতি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন এটি ন্যায়বিচারকে আড়াল করার কৌশল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক (অব.) ড. আমিনুল হক বলেন,
“বিচারহীনতার সংস্কৃতি যদি আবার ফিরে আসে, তাহলে জুলাই অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ অর্থহীন হয়ে যাবে। দায়মুক্তি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে পারে, কিন্তু তা ন্যায়বিচারের কফিনে শেষ পেরেকও হতে পারে।”
রাজনৈতিক পক্ষগুলোর অবস্থান
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।
গণজাগরণ মঞ্চ ও নাগরিক ঐক্য বলেছে, “দায়মুক্তি মানে অপরাধীদের রক্ষা।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, “দায়মুক্তি ধারা অস্থায়ী; এটি কেবল শান্তি ও পুনর্মিলনের প্রাথমিক পদক্ষেপ।”
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এ বিষয়টিকে “দ্বৈত নীতি” বলে সমালোচনা করেছে।
জনগণের প্রত্যাশা: ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতার ভারসাম্য
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের জনগণ এখন প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতা দুটোই চায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে অতীতের অপরাধ ভুলে যাওয়া যাবে।
মানবাধিকারকর্মী রুবিনা রহমান বলেন,
“জুলাই সনদ যদি সত্যিকারের জাতীয় পুনর্জাগরণের দলিল হতে চায়, তবে দায়মুক্তির ধারা অপসারণ করে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে।”
বিশ্লেষণমূলক উপসংহার
“জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫” নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মাইলফলক হতে পারে—যদি তা ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও পুনর্গঠনের সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করে।
কিন্তু যদি দায়মুক্তির নামে বিচারবহির্ভূত সমঝোতার পথ নেওয়া হয়, তাহলে এটি জাতির মধ্যে নতুন বিভাজন ও অনিশ্চয়তা ডেকে আনবে।
বাংলাদেশ আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে জনগণের একটাই প্রত্যাশা—ন্যায়বিচারের মাধ্যমে শান্তি, দায়মুক্তির মাধ্যমে নয়।