রিপোর্ট: Daily Crisis BD নিউজ বিশ্লেষণ বিভাগ
তারিখ: ২১ অক্টোবর ২০২
উপশিরোনাম:
অন্তরবর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতি স্পষ্ট জাতীয় স্বার্থের বাইরে কোনো চুক্তি টিকবে না
রিপোর্ট:
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে করা একের পর এক চুক্তি ও প্রকল্প পুনর্বিবেচনার আওতায় এসেছে। ইতিমধ্যে হাসিনা সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। আরও কয়েকটি চুক্তি “স্থগিত” বা “পুনর্বিবেচনা” অবস্থায় রয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে।
এই পদক্ষেপকে অনেক বিশ্লেষক “বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক মোড়” হিসেবে দেখছেন।
🇧🇩 বাতিল হওয়া প্রধান চুক্তিগুলো এক নজরে
ক্র. চুক্তি / প্রকল্পের নাম স্বাক্ষরের সাল সিদ্ধান্তের ধরন
1 ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম রেল সংযোগ প্রকল্প ২০১৭ বাতিল
2 অভয়পুর-আখাউড়া রেলপথ সম্প্রসারণ ২০১৮ বাতিল
3 আশুগঞ্জ-আগরতলা করিডর ২০১৬ বাতিল
4 ফেনী নদী পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প ২০১৯ বাতিল
5 কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন প্রকল্প — স্থগিত
6 বন্দরের ব্যবহার সংক্রান্ত সড়ক ও নৌপথ উন্নয়ন চুক্তি ২০১৮ বাতিল
7 ফারাক্কাবাদ সংক্রান্ত প্রকল্পে বাংলাদেশের আর্থিক সহযোগিতা প্রস্তাব ২০২৩ বাতিল
8 সিলেট-শিলচর সংযোগ প্রকল্প ২০২০ বাতিল
9 পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন সম্প্রসারণ চুক্তি ২০১৯ বাতিল
10 ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল (মিরসরাই ও মোংলা IEZ) ২০১৯ বাতিল
11 আদানি পাওয়ার বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি ২০১৭ পুনর্বিবেচনা
12 গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ১৯৯৬ নবায়ন / পুনর্বিবেচনা
13 তিস্তা নদী পানি বণ্টন চুক্তি (খসড়া অবস্থায়) ২০১১ আলোচনায়
14 ভারতীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানি GRSE-এর সঙ্গে টাগ বোট চুক্তি ২০২৪ বাতিল
🔍 বিশ্লেষণ: কেন এই চুক্তিগুলো বাতিল করা হলো?
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বেশ কয়েকটি চুক্তি ছিল একতরফা সুবিধাভিত্তিক।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করেই এসব প্রকল্পে স্বাক্ষর হয়েছিল।
১⃣ পরিবহন ও রেল সংযোগ চুক্তিগুলো মূলত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর জন্য বাণিজ্যিক সুবিধা তৈরি করেছিল, কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুনাফা ছিল সীমিত।
২⃣ ফেনী ও কুশিয়ারা নদীর পানি প্রকল্প নিয়ে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়, কারণ এতে বাংলাদেশের পানিসম্পদ নিয়ন্ত্রণে ভারতের প্রভাব বেড়ে যায়।
৩⃣ মিরসরাই ও মোংলায় ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল (IEZ) গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পনীতি ও কর নীতিতে ভারতের প্রত্যক্ষ দখলদারিত্ব তৈরি হচ্ছিল—যা এখন সম্পূর্ণ বাতিল।
৪⃣ আদানি পাওয়ার চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক ছিল। উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ আমদানির এই চুক্তি এখন পুনর্বিবেচনায় এসেছে।
🇧🇩 অন্তরবর্তী সরকারের অবস্থান
নতুন সরকার একাধিকবার স্পষ্ট করে জানিয়েছে —
“বাংলাদেশের কোনো চুক্তি যদি জাতীয় স্বার্থবিরোধী হয়, তবে সেটি টিকবে না।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “আমরা বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু বন্ধুত্বের নামে একতরফা স্বার্থ চাপিয়ে দেওয়া নয়। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”
🌊 তিস্তা ও গঙ্গা: দুই নদী, দুই প্রেক্ষাপট
তিস্তা চুক্তি (২০১১ খসড়া): এই চুক্তি বহুদিন ধরে ঝুলে ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনীহায়। এখন নতুন সরকার বাংলাদেশ-ভারত যৌথ আলোচনার মাধ্যমে নতুন কাঠামোতে বাস্তবায়নের পথ খুঁজছে।
গঙ্গা চুক্তি (১৯৯৬): মেয়াদ শেষের পথে এই চুক্তি। বাংলাদেশ পক্ষ এখন পুনর্বিবেচনা চায় যাতে ন্যায্য পানি বণ্টন নিশ্চিত হয়।
⚙ অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় নতুন ভারসাম্য এই সিদ্ধান্তগুলো শুধু রাজনৈতিক বার্তা নয়
এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও কৌশলগত নিরাপত্তা পুনর্গঠনের রূপরেখা।
দেশীয় শিল্প, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে এখন বিকল্প বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পথ খোঁজা হচ্ছে বিশেষ করে চীন, তুরস্ক, ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে।
উপসংহার
হাসিনা সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে যেভাবে একতরফা চুক্তি হয়েছিল, তা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী বলেই মনে করছেন নতুন সরকার ও বিশ্লেষকরা।
এখন সময় এসেছে “সমান মর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মান” ভিত্তিক কূটনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার।
বাংলাদেশ আর কারও করিডর নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে নতুন ভূমিকায় উঠে আসছে।
রিপোর্ট: Daily Crisis BD নিউজ বিশ্লেষণ বিভাগ
তারিখ: ২১ অক্টোবর ২০২৫