ইরানের এক শীর্ষ সামরিক কমান্ডার সতর্ক করে বলেছেন, শত্রুর যেকোনো ভুলের জবাব এবার হবে পূর্বের সব প্রতিক্রিয়ার চেয়ে ‘একেবারে ভিন্ন ও কঠোর’। তিনি সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিদিন তা আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আবদুররহিম মুসাভি বলেন, ‘ইরানে হামলা চালিয়ে ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, জনঅসন্তোষ ও লজ্জাজনক অবস্থান থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা ভয়াবহ পরাজয়ের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির ভিক্ষা চেয়েছে।’
গত ১৩ জুন ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে অঘোষিত ও উসকানিমূলক হামলা চালায়, যা টানা ১২ দিন স্থায়ী হয়। এতে অন্তত ১ হাজার ৬৪ জন নিহত হন—যাদের মধ্যে ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা, পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও সাধারণ নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্রও এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয় এবং তিনটি ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়, যা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে তেহরান।
এর জবাবে ইরানি বাহিনী অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনা এবং কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটি—যা পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি—লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদরেজা নাকদি বলেন, ‘আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা একটুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আমাদের মিসাইলগুলো অক্ষত এবং সম্পূর্ণ প্রস্তুত।’
তিনি আরও জানান, ইসরায়েল যে দাবি করছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ‘আমরা তাদের আগ্রাসনের জবাব যথাযথভাবে দিয়েছি,’ বলেন নাকদি।
অন্যদিকে, মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি জানান, ইসরায়েলি হামলার পর ইরান অন্তত দুই মাসের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। ‘আমাদের কৌশল ছিল ধীরে ধীরে আরও কার্যকর ও ধ্বংসাত্মক পাল্টা আঘাত হানা,’ বলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সূত্র জানিয়েছে, ওই যুদ্ধে মাত্র ১২ দিনেই আমেরিকা তাদের উচ্চক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশ ‘থাড’ (THAAD) মিসাইল ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ফেলে। ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ১০০ থেকে ১৫০টির মতো থাড ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে—যা তাদের বিশাল স্টকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনায় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, এমন সময়ে যখন ইসরায়েলকে রক্ষা নিয়ে মার্কিন জনগণের সমর্থন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে আইআরজিসি ১২ দিনের মধ্যে ২২ দফা নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এসব হামলায় ইসরায়েলের সামরিক, গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর বড় অংশ ভেঙে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করে তেলআবিবকে।
ইসরায়েল এ ঘটনায় কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করেছে। বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, স্যাটেলাইট চিত্র সীমিতকরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত ভিডিও বন্ধে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরায়েলের প্রধান সামরিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে ছিল ‘কিরিয়া’ (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা সদর দফতর), ‘ক্যাম্প মোশে দায়ান’, ‘টেল নফ’ এয়ারবেস (যেখানে মার্কিন তৈরি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান থাকে), ‘নেভাতিম’ ও ‘হাটজেরিম’ এয়ারবেসসহ ‘ওভদা’ ঘাঁটি—যেখানে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও কমান্ড সেন্টার পরিচালিত হয়।
ইরান বহুবার স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব বা নিরাপত্তার প্রতি যেকোনো হুমকির জবাব তারা ‘চূড়ান্ত ও ধ্বংসাত্মকভাবে’ দেবে।
সূত্র: প্রেস টিভি, রয়টার্স, ফার্স নিউজ, আল জাজিরা