২১শে জুলাই, ২০২৫ মিরপুরের এক শান্ত দুপুর হঠাৎই রক্তে রঞ্জিত হয়। যৌথবাহিনীর হাতে তিন যুবদল নেতা আটক হন, যাদের একজন ছিলেন আসিফ শিকদার। ৩০ রাউন্ড গুলিসহ আটক করা হয়েছিল তাদের। প্রথমে সায়েন্স ল্যাব এলাকার সেনা ক্যাম্পে, পরে শাহ আলী থানায় নেওয়া হয়। এরপর অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়ার পথে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আসিফ।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
কিন্তু এখানেই শেষ নয় এ মৃত্যু যেন অন্তর্বর্তী সরকারের মানবাধিকার চিত্রে আরেকটি রক্তরেখা টেনে দিল
১৪ মাসে ৪০ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
এর মধ্যে—
১৯ জনকে গুলিতে হত্যা,
১৪ জনকে নির্যাতনে হত্যা,
এবং ৭ জনকে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয় এটি এমন এক বাস্তবতা, যা সরকারের নৈতিক অবস্থান ও গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
যারা একসময় সমালোচক ছিলেন, আজ তারা নীরব
ব্যঙ্গাত্মক হলেও সত্য, অন্তর্বর্তী সরকারের যেসব সদস্য একসময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের তীব্র সমালোচক ছিলেন, আজ তারা ক্ষমতায় থেকেও কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারেননি।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, “অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি ও অবস্থান শুরু থেকেই ম্লান ছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হওয়ায় তারা শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।”
একজন বিশ্লেষক বলেন,
আগের সরকার শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল; আর এখনকার সরকার সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার কাছে অসহায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু তার পরিণতি দাঁড়িয়েছে দমননীতি, যেখানে ‘নিরাপত্তা রক্ষার’ নামে ঘটছে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এমনকি সরকারি কোনো তদন্তের ফলাফলও এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
আসিফ শিকদারের মৃত্যু যেন এক প্রতীকি বার্তা যে সরকার গণআন্দোলনের মাধ্যমে মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করেছিল, সেই সরকারই এখন মানবাধিকার হুমকির মুখে ফেলেছে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের ভাষায়,
এটি কেবল এক ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এটি আইনের শাসনের মৃত্যু।
এই ঘটনায় সরকারের প্রেস উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সরকারি নীরবতাই এখন সবচেয়ে জোরালো প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু হয়েছিল এক আশার সুরে ‘দায়মুক্তি নয়, দায়বদ্ধতা’। কিন্তু ১৪ মাসের ব্যবধানে সেই সুর বদলে গেছে আতঙ্কে, অবিশ্বাসে, আর রক্তে।
যদি এই ধারাবাহিকতা না থামে, তবে দেশের মানবাধিকার ইতিহাসে এই সময়টাও হয়তো রয়ে যাবে এক অপ্রকাশিত অধ্যায় হিসেবে “বিচারবহির্ভূত ন্যায়বিচারের যুগ”।