ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ ও বৈশ্বিক আস্থার সংকটকে নতুন করে সামনে আনছে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ০৫ জানুয়ারি ২০২৬
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে বিশেষ অভিযানে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার খবরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। জাতিসংঘসহ বহু দেশ এটিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে, যা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ও বৈশ্বিক আইনের ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, গত ৩ জানুয়ারি মধ্যরাতে মার্কিন ডেল্টা ফোর্স একটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিউ ইয়র্ক ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়। তবে এই ঘটনার মাধ্যমে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—একটি রাষ্ট্র কি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের তোয়াক্কা না করে অন্য একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে বিচারাধীন করতে পারে?
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বহু দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এটি শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক বিরোধ নয়; বরং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করার শামিল। সার্বভৌমত্ব কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়—এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা, নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ তাদের দীর্ঘদিনের হস্তক্ষেপমূলক পররাষ্ট্রনীতিরই ধারাবাহিকতা। অতীতে পানামা, ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান, সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা কিংবা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষার নজির রয়েছে। এসব পদক্ষেপ ‘গণতন্ত্র’ বা ‘নিরাপত্তা’র নামে পরিচালিত হলেও বাস্তবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভাঙন, সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।
এই ধরনের একতরফা কর্মকাণ্ড বিশ্বব্যাপী একটি গভীর আস্থাসংকট তৈরি করেছে। অনেক রাষ্ট্র এখন মনে করে, আন্তর্জাতিক আইন সবার জন্য সমান নয়—শক্তিধর রাষ্ট্রের জন্য এক নিয়ম, দুর্বলদের জন্য আরেক নিয়ম। এতে জাতিসংঘের মতো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নতুন নয়। হুগো চাভেজের সময় থেকে শুরু করে নিকোলাস মাদুরোর নেতৃত্বে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো প্রত্যাখ্যান করে তেল খাত জাতীয়করণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে। রাশিয়া, চীন ও ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলায় ভেনেজুয়েলা ওয়াশিংটনের কাছে একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়।
সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের বদলে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ কৌশল গ্রহণ করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। এর মধ্যে রয়েছে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ, বিরোধী শক্তিকে সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা। ২০১৯ সালে বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদোকে ‘অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াও এই কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হয়।
বিশ্ব প্রতিক্রিয়া এই ইস্যুতে বিভক্ত। লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশ সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিলেও রাশিয়া, চীন, ইরান ও তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকরাও একতরফা নিষেধাজ্ঞাকে মানবিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করেছেন।
এই পরিস্থিতির প্রভাব বৈশ্বিক রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী। যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে, গ্লোবাল সাউথে বিশ্বাসযোগ্যতা কমেছে এবং বিকল্প জোট ও ডি-ডলারাইজেশন প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক যুগে শাসন পরিবর্তনের কৌশল যে সামরিক আগ্রাসন থেকে আইনি ও অর্থনৈতিক চাপে রূপ নিয়েছে—এই বাস্তবতাও স্পষ্ট হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শক্তির একতরফা প্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালিত হলে স্থায়ী শান্তি অসম্ভব। পারস্পরিক সম্মান, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং বহুপক্ষীয়তার প্রতি বাস্তব অঙ্গীকারই পারে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে। ভেনেজুয়েলা ইস্যু সেই কঠিন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।