আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে দেখছে ইইউ, ঢাকায় জানালেন প্রধান পর্যবেক্ষক ইভারস আইজাবস
ঢাকা, বাংলাদেশ — ১১ জানুয়ারি ২০২৬
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে বড় আকারের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। রোববার ঢাকায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এক বৈঠকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ও ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভারস আইজাবস এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বৈঠকে নির্বাচন প্রস্তুতি, সমতা ভিত্তিক মাঠ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড), গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
প্রেস সচিব জানান, ইভারস আইজাবস বৈঠকে বলেছেন—বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন হিসেবে দেখছে। এ কারণেই তারা বড় আকারের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনেক দেশেই নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠায় না। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং বড় বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব রয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, শেখ হাসিনার প্রায় সাড়ে ১৬ বছরের শাসনামলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একবারও বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠায়নি। ইভারস আইজাবসের মতে, আগের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। তবে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে ইতিবাচক মনোভাব ও জনসম্পৃক্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বৈঠকে আওয়ামী লীগ বা দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে গণভোট প্রসঙ্গে ইভারস আইজাবস বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রেস সচিব বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। তারা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য অংশীজনদের সঙ্গেও কথা বলবে এবং পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আশ্বস্ত করে বলেন, আসন্ন নির্বাচন ও গণভোট হবে অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য, শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে।
নির্বাচনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জন্য বডি-ওর্ন ক্যামেরা থাকবে। এসব ক্যামেরা একটি কেন্দ্রীয় অ্যাপের মাধ্যমে উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও ঢাকা থেকে সরাসরি মনিটর করা যাবে। সব ভোটকেন্দ্রে থাকবে সিসিটিভি ক্যামেরা। দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনী র্যাপিড রেসপন্স স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে প্রস্তুত থাকবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চাওয়ার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আইনগত মতামত নিয়েছে জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, শীর্ষ আইন বিশেষজ্ঞরা লিখিতভাবে জানিয়েছেন—এ বিষয়ে কোনো আইনগত বাধা নেই। ফলে সরকার এ বিষয়ে প্রচার ও জনসচেতনতা কার্যক্রম চালাবে।
প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচার শুরু হবে। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক পাঠানো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ক্ষেত্রে একটি বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
তবে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচারের কথা উল্লেখ করেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচারের সমর্থকেরা নির্বাচন বিঘ্নিত করার চেষ্টা করতে পারে। এসব অপচেষ্টা মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
ব্রিফিংয়ে আরও জানানো হয়, নারী ও তরুণদের মধ্যে ভোট নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। ফলে এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোটার উপস্থিতির আশা করছে সরকার। ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।