সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাবে সংঘাত, সংকটের শঙ্কায় আরএমজি খাত
ঢাকা, বাংলাদেশ — ২০ জানুয়ারি ২০২৬
দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ভারত থেকে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে দেশের দুই শীর্ষ খাত—বস্ত্রকল ও তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকরা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্প (আরএমজি) গভীর সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পোশাক রপ্তানিকারকরা। তাদের মতে, কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত সুতার আমদানি ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও বড় ধরনের ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হবে।
অন্যদিকে, বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) মনে করছে, বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার না করলে দেশীয় সুতা উৎপাদন শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। সংগঠনটির দাবি, শুল্কমুক্ত আমদানির কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০টি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আরও কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, বিটিএমএর গত ১৭ সেপ্টেম্বর ও ২৯ ডিসেম্বরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও-২ শাখা ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত আমদানি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অনুরোধ জানিয়েছে। তবে গতকাল সোমবার পর্যন্ত এনবিআর এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, নির্দিষ্ট মানের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা না হলে দেশীয় স্পিনিং শিল্প পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। দেশীয় কারখানাগুলো বন্ধ হলে ভবিষ্যতে নিট পোশাক খাত আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও শিল্প কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর হবে। তবে বন্ড সুবিধা বহাল থাকবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার এনবিআরের।
এদিকে, সরকারের এই প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল সোমবার যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে তৈরি পোশাকশিল্পের দুই শীর্ষ সংগঠন—বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, বিশ্ববাজারের মন্দাভাব, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের ত্রিমুখী চাপে শিল্প যখন নাজুক অবস্থায়, তখন সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে পোশাক রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমেছে এবং শুধু ডিসেম্বরেই রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।
তার মতে, উচ্চমূল্যে সুতা কিনতে হলে ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দেবেন, যা সরাসরি ও পরোক্ষভাবে রপ্তানিখাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তিনি বস্ত্রখাতকে সহায়তায় শুল্ক আরোপের পরিবর্তে নগদ সহায়তা, করপোরেট করছাড়, স্বল্প সুদে ঋণ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির কারণে স্থানীয় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১০০টি টেক্সটাইল মিল আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার সুতা আমদানি করেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে ভারত থেকে। ভারতের সরকারি ভর্তুকির কারণে সে দেশের রপ্তানিকারকরা প্রতি কেজিতে প্রায় ০ দশমিক ৩০ ডলার কম দামে বাংলাদেশে সুতা সরবরাহ করতে পারছেন।
বাজার বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশীয় সুতার দাম কেজিতে ২ দশমিক ৭০ থেকে ২ দশমিক ৭৫ ডলার, যেখানে আমদানিকৃত ভারতীয় সুতার দাম ২ দশমিক ৫৫ থেকে ২ দশমিক ৬০ ডলার।