সুবিধাবাদী সাংবাদিকতার মুখোশ
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বড় সংকট হলো অনেকে টকশোতে মুক্তচিন্তা ও প্রতিবাদের কথা বলেন, কিন্তু বাস্তবে অন্যায়ের সামনে নীরব থাকেন। খালেদ মহিউদ্দিন সেই উদাহরণগুলোর একটি।
আমাদের সাংবাদিকতার সমস্যা যারা টিভিতে সাহসের বুলি আওড়ান, তারা বাস্তবে নীরব। খালেদ মহিউদ্দিনদের মতো সুবিধাভোগীরা হাসিনাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন, কিন্তু খুনি বলার সাহস দেখাতে পারেন না।
সাংবাদিকতা শুধু বিশ্লেষণের বিষয় নয়, নৈতিক অবস্থান নেওয়ারও বিষয়। যখন ভয় ও সুবিধা নৈতিকতার জায়গা দখল করে নেয়, তখন সাংবাদিকতা আর সমাজের পক্ষে থাকে না শুধু ক্ষমতার পাশে দাঁড়ায়।একজন সাংবাদিক যখন তার নৈতিকতা বিসর্জন দেন এবং দেশ, জাতি বিরোধী কাজ করেন, তখন দেশ ও জাতির বহুবিধ ও সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হতে পারে। সাংবাদিকতাকে ‘গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়, এবং এই স্তম্ভের দুর্বলতা বা পতন সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এখানে প্রধান ক্ষতিগুলো উল্লেখ করা হলো:
১. জনগণের আস্থা হারানো ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি
উদাসীনতা সৃষ্টি: জনগণ যখন দেখে সত্য প্রকাশের কোনো মূল্য নেই, তখন তারা অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে উদাসীন হয়ে পড়ে, যা একটি সুস্থ সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
সারসংক্ষেপে, সাংবাদিকের নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়া কেবল একটি পেশাগত ব্যর্থতা নয়, এটি গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করে, দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে এবং জাতীয় সংহতি ও নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে।
সত্য আড়াল ও মিথ্যা প্রচার: নৈতিকতাবিহীন সাংবাদিকরা ব্যক্তিগত স্বার্থ, অর্থ বা ক্ষমতার লোভে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে বা গুরুত্বপূর্ণ সত্য আড়াল করে। ফলে জনগণ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয় এবং বিভ্রান্তিতে ভোগে।
সংবাদমাধ্যমের ওপর অনাস্থা: বারবার বিকৃত বা সাজানো সংবাদ দেখলে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে পুরো সংবাদমাধ্যমের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। এতে জরুরি পরিস্থিতিতেও জনগণ সঠিক তথ্যসূত্র খুঁজে পায় না।
বিভাজন ও উসকানি: সাংবাদিকরা যদি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, দল বা ব্যক্তির পক্ষে পক্ষপাতিত্ব করে বা উসকানিমূলক ও বিভেদ সৃষ্টিকারী সংবাদ প্রচার করে, তবে সমাজে জাতিগত, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে।
২. গণতন্ত্র ও সুশাসনের ক্ষতি
জবাবদিহিতার অভাব: একজন সৎ সাংবাদিকের কাজ হলো ক্ষমতাবানদের ভুলত্রুটি, দুর্নীতি ও অন্যায়কে জনসমক্ষে তুলে ধরা। কিন্তু নৈতিকতাবিহীন সাংবাদিকরা উল্টো ক্ষমতাসীনদের সাফাই গায় বা তাদের দালালি করে। এতে সরকার বা ক্ষমতাবানদের জবাবদিহিতা কমে যায়, যা সুশাসনের পথে প্রধান বাধা।
দুর্নীতিকে প্রশ্রয়: যখন সাংবাদিকরা দুর্নীতির খবর প্রকাশ না করে উল্টো তা ধামাচাপা দেয় বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করে, তখন সমাজে দুর্নীতি আরও প্রসার লাভ করে।
স্বৈরাচার ও দমননীতির বিস্তার: গণমাধ্যমকে জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করার কথা। কিন্তু যখন তা ক্ষমতার দাসে পরিণত হয়, তখন জনগণের অধিকার রক্ষা হয় না, এবং স্বৈরাচারী বা দমনমূলক নীতিগুলো সমাজে আরও সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি
রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য প্রকাশ: দেশবিরোধী কার্যকলাপের অংশ হিসেবে সাংবাদিক যদি রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীল বা গোপন তথ্য শত্রুপক্ষ বা অন্য রাষ্ট্রের কাছে পাচার করে দেয়, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন: আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় এমন মিথ্যা, বিকৃত বা অতিরঞ্জিত সংবাদ পরিবেশন করলে বিদেশি বিনিয়োগ, পর্যটন, ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৪. সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়
নৈতিকতার মানদণ্ড হ্রাস: যখন সমাজের অন্যতম প্রভাবশালী পেশার (সাংবাদিকতা) নৈতিকতার মানদণ্ড নিম্নগামী হয়, তখন তরুণ প্রজন্ম সহ সাধারণ মানুষের মনে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ঘোলাটে হয়ে যায়।