দীর্ঘ দেড় বছর পর জুলাই আন্দোলনে শহীদ সন্তানদের কবর খুঁজে পেয়ে রায়েরবাজার কবরস্থানে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা; আবেগঘন পরিবেশে ৮ শহীদের কবর হস্তান্তর
ঢাকা | ৫ জানুয়ারি ২০২৬
দীর্ঘ দেড় বছর অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা আর বেদনার পর প্রিয় সন্তানের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি শহীদদের স্বজনরা। রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে জুলাই আন্দোলনে নিহত সন্তানদের কবর শনাক্ত হওয়ার পর কান্না, আহাজারি আর স্মৃতিচারণে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
যাত্রাবাড়ীর কাজলায় আন্দোলনে শহীদ সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম ছেলের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছেলের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন,
‘বাবা তুই আমারে কিছুই বলে গেলি না। আমার পায়ে তেল মালিশ করে ঘুমিয়ে রেখে চলে গেলি। বাবা, আর তোরে পাইলাম না।’
একইভাবে উত্তরায় নিহত ফয়সাল সরকারের মা হাজেরা বেগম, মোহাম্মদপুরে নিহত মাহিমের মা জোসনা বেগম ও তার স্ত্রীসহ অন্যান্য স্বজনরাও প্রিয়জনের কবরের ওপর দাঁড়িয়ে আহাজারিতে ভেঙে পড়েন।
দীর্ঘদিন পর সন্তানের কবর পেয়ে কেউ পানি ঢালছেন, কেউ মাটি ছুঁয়ে দেখছেন, কেউ আবার কবরে লাগানো গাছে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। স্বজনদের কান্নায় আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। পরিবারের অন্য সদস্যরা এ সময় তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এক মাসের প্রচেষ্টায় রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা অজ্ঞাত শহীদদের মধ্যে সোমবার ৮ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়। সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টার উপস্থিতিতে স্বজনদের কাছে কবর হস্তান্তর করা হয়।
🕊️ শনাক্ত হওয়া জুলাই যোদ্ধারা
- কাবিল হোসেন (৫৮) — মাদারটেক
বাবা: মৃত বুলু মিয়া | মা: ছামেনা বেগম - সোহেল রানা (৩৮) — যাত্রাবাড়ী (কাপড় ব্যবসায়ী)
বাবা: মো. লাল মিয়া | মা: রাশেদা বেগম - আসাদুল্লাহ (৩১) — উত্তরা
- পারভেজ ব্যাপারী (২৩) — বাড্ডা
বাবা: সবুজ ব্যাপারী | মা: শামসুন্নাহার - রফিকুল ইসলাম (২৯) — যাত্রাবাড়ী
বাবা: মৃত খোরশেদ আলম | মা: আলেয়া বেগম - মাহিম (৩২) — মোহাম্মদপুর
বাবা: গাজী মাহমুদ | মা: জোসনা বেগম - ফয়সাল সরকার (২৬) — উত্তরা
বাবা: শফিকুল ইসলাম | মা: হাজেরা বেগম - রফিকুল ইসলাম (৫২)
বাবা: মৃত আব্দুল জব্বার শিকদার | মা: জাহানারা বেগম
🔬 সিআইডির বক্তব্য
কবর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহ বলেন,
জুলাই ১৫ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১১৪টি কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও প্রোফাইলিং করা হয়েছে। অজ্ঞাত শহীদদের ৯টি পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে সোমবার ৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অপর একজন শহীদের নাম জিলানি।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর বিশেষ প্রস্তুতির পর আনুষ্ঠানিকভাবে মরদেহ উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্ট ড. লুইস ফনডেরিডার-এর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় এই নমুনা সংগ্রহের কাজ পরিচালিত হয়।