চট্টগ্রাম | প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬
চট্টগ্রাম মহানগরীতে থানার ওসি পদে ঘন ঘন রদবদল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ২০ মাসে একাধিকবার একই ধরনের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ থানায় ঘুরেফিরে পদায়ন হওয়ায় বদলির পেছনে অদৃশ্য প্রভাব ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ সামনে এসেছে।
ঘন ঘন বদলিতে স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন
চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা পুলিশের বিভিন্ন থানায় গত ২০ মাসে ধারাবাহিকভাবে ওসি বদল হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একযোগে ৩০ থানার ওসিকে বদলি করা হয়, যার মধ্যে মহানগরের ১৩টি ও জেলার ১৭টি থানা ছিল।
এরপর বিভিন্ন সময় নতুন করে কোতোয়ালি, বন্দর, পতেঙ্গা, কর্ণফুলী, সদরঘাট, চান্দগাঁও ও ডবলমুরিংসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক দফায় রদবদল হয়। ২০২৫ সালের শেষ দিনেও সদরঘাট, চান্দগাঁও ও ডবলমুরিং থানায় নতুন ওসি পদায়ন করা হয়।
একই কর্মকর্তাদের ঘুরেফিরে পদায়ন
বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন মুখ আনার পরিবর্তে একই কর্মকর্তাদের এক থানা থেকে আরেক থানায় ঘুরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। বন্দর, ইপিজেড, পাহাড়তলী, বায়েজিদ বোস্তামী, কোতোয়ালি, পাঁচলাইশ, বাকলিয়া ও কর্ণফুলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ থানাগুলোতে একই সার্কেলের কর্মকর্তাদের পদায়ন বেশি দেখা যাচ্ছে।
ফলে বাস্তবে নেতৃত্বে বৈচিত্র্য আসছে না; বরং একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক বলয়ের ভেতরেই দায়িত্ব বণ্টন সীমাবদ্ধ থাকছে। এতে ‘পছন্দের পোস্টিং’ বা ‘হট থানা’ ঘিরে অঘোষিত প্রতিযোগিতার অভিযোগও জোরালো হয়েছে।
‘হট থানা’ কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ
চকবাজার, কোতোয়ালি, বন্দর, ডবলমুরিং, পতেঙ্গা, ইপিজেড, পাহাড়তলী ও কর্ণফুলী থানাকে প্রশাসনিকভাবে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। কারণ এসব থানা শিল্প, বন্দর, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
এসব থানায় দায়িত্ব মানে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণের সুযোগও পাওয়া। ফলে এসব থানায় পদায়নকে অনেক কর্মকর্তা আকর্ষণীয় হিসেবে বিবেচনা করেন।
সুশাসনকর্মীদের উদ্বেগ
আখতার কবির চৌধুরী বলেন, কয়েক মাস পরপর ওসি বদলি হলে কার্যকর পুলিশিং বাধাগ্রস্ত হয়। একটি থানার অপরাধচক্র, সামাজিক বাস্তবতা ও গোয়েন্দা তথ্য বুঝে উঠতেই একজন কর্মকর্তার সময় লাগে। ঘন ঘন বদলি হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির বদলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, গুরুত্বপূর্ণ থানায় একই কর্মকর্তাদের বারবার পদায়ন হলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বদলি প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট নীতিমালা ও জবাবদিহির আওতায় না থাকলে জনগণের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
প্রশাসনিক ব্যাখ্যা
খোদা বখশ চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ঘন ঘন বদলি অনেক সময় স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পদে দ্রুত পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্ব পুনর্গঠন করা হয়।
তার মতে, জাতীয় নির্বাচন বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতেও এ ধরনের বদলি করা হয়ে থাকে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশ নীতিমালা অনুযায়ী একজন ওসি সাধারণত দীর্ঘ সময় একটি থানায় দায়িত্ব পালন করলে স্থানীয় অপরাধচিত্র সম্পর্কে গভীর ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু কয়েক মাস পরপর বদলি হলে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি হয়।
চট্টগ্রামের ওসি বদলির এই ধারাবাহিকতা নিয়ে এখন মূল প্রশ্ন—এটি কি কেবল প্রশাসনিক প্রয়োজন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো অদৃশ্য প্রভাব কাজ করছে।