রাজশাহী ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মোগল আমলের কর্মচারী ও দিনলিপিকার আবদুল লতিফ তাঁর বাংলাগামী যাত্রার বিবরণে যে জনপদের কথা মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন, তা হলো বর্তমান রাজশাহীর ঐতিহাসিক বাঘা মসজিদ। মসজিদের পাশের সুবিশাল মাদরাসা, মনোরম দিঘি ও হাওধা মিয়ার আধ্যাত্মিক প্রভাব—সব মিলিয়ে এটি ছিল ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল কেন্দ্র।
আবদুল লতিফ ছিলেন সম্রাজ্ঞী মুমতাজ মহল–এর পিতা খাজা আবুল হাসান ইয়ামিনুদ্দৌলার বিশিষ্ট সহযোগী ও একান্ত অনুচর। ৬ মে ১৬০৮ সালে ইসলাম খান চিশতি বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হলে খাজা আবুল হাসান দেওয়ান হিসেবে দায়িত্ব পান। তাঁদের সঙ্গেই বাংলায় আসেন আবদুল লতিফ এবং যাত্রাপথের দিনলিপি রচনা করেন।
তার বিবরণে উঠে আসে বাঘা অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ধর্মীয় পরিবেশ। তিনি উল্লেখ করেন, ৯৩০ হিজরি সালে নির্মিত এক মনোরম মসজিদের কথা, যা তৎকালীন বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ–এর নামে পরিচিত হলেও প্রকৃত নির্মাতা ছিলেন নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ।
মসজিদের পাশেই ছিল একটি সুবিশাল দিঘি—যার পানি তিনি বেহেশতের আবে-কাওসারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দিঘিকে ঘিরে হাওধা মিয়া নামে প্রায় শতবর্ষীয় এক বুজুর্গের আবাস ও তার অনুসারীদের নির্মিত চকবন্দি গৃহসমষ্টির বর্ণনা দেন তিনি।
হাওধা মিয়ার গৃহসংলগ্ন খড়ের ছাউনি ও কাদামাটির প্রলেপে নির্মিত একটি মাদরাসার কথাও উল্লেখ করেন আবদুল লতিফ। সেখানে বহু ছাত্র অধ্যয়ন করত। দিঘির পাড়ে সারিবদ্ধ কাঁঠাল ও আমগাছ, সবুজ প্রান্তর ও নির্জন পরিবেশ—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি ছিল শান্ত, সজীব ও আধ্যাত্মিক আবহে পূর্ণ।
তিনি লিখেছেন, জীবিকা নির্বাহের জন্য এই স্থান হাওধা মিয়াকে ‘মাদাদে-মাআশ’ হিসেবে দান করা হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, “এই প্রদেশে আমরা এ স্থান ছাড়া ইসলামের স্নিগ্ধ আবহের বাহক এবং জনসমাগম ও কোলাহল থেকে মুক্ত অন্য কোনো জনপদ দেখিনি।”
বর্তমানে বাঘা মসজিদ বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত। মসজিদের পাশে অলি-আউলিয়াদের মাজারকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর ওরস অনুষ্ঠিত হয়। ঈদ উপলক্ষে বসে ঐতিহ্যবাহী মেলাও।
তবে আবদুল লতিফ যে সুবিশাল মাদরাসা ও বিদ্যাপীঠের বর্ণনা দিয়েছেন, তার কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না—সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে সেই শিক্ষাকেন্দ্র।