ঢাকা, ১১ মার্চ ২০২৬
পবিত্র রমজান মুসলমানদের জন্য সংযম, আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের মাস। তবে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে রোজা রাখার বিষয়টি কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ এ সময় মায়ের পাশাপাশি গর্ভের শিশুর সুস্থতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে মায়ের শারীরিক অবস্থা, পুষ্টি এবং গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব গর্ভবতী নারী একইভাবে রোজা রাখতে পারবেন—এমনটি নয়। কেউ হয়তো সুস্থ অবস্থায় রোজা রাখতে পারেন, আবার কারো জন্য তা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কখন রোজা রাখা তুলনামূলক নিরাপদ
কিছু পরিস্থিতিতে গর্ভবতী মা চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে রোজা রাখতে পারেন। যেমন—
- মা শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলে।
- রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক থাকলে।
- গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন স্বাভাবিক থাকলে।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কোনো জটিলতা না থাকলে।
- অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা বমি না থাকলে।
তবে এসব ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের অনুমতি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে চিকিৎসকরা মনে করেন।
যেসব ক্ষেত্রে রোজা না রাখাই ভালো
কিছু পরিস্থিতিতে গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যেমন—
- অতিরিক্ত বমি বা শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে।
- রক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া) বেশি থাকলে।
- ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে।
- যমজ বা একাধিক সন্তান ধারণ করলে।
- গর্ভের শিশুর ওজন কম হলে।
- শিশুর নড়াচড়ায় অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে।
- অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অজ্ঞান হওয়ার প্রবণতা থাকলে।
এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোজা থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ।
রোজা রাখতে চাইলে যেসব নিয়ম মানা জরুরি
গর্ভবতী মা যদি চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে রোজা রাখতে চান, তাহলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা প্রয়োজন।
- ইফতার থেকে সাহরি পর্যন্ত ধীরে ধীরে অন্তত ৮–১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত।
- ইফতারে ফল, শাকসবজি, দুধ, খেজুর, ডিম ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা ভালো।
- সাহরিতে ভাত বা রুটি, ডাল, ডিম, দুধ, দই ও সবজি খেলে দীর্ঘ সময় শক্তি বজায় থাকে।
- অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
- চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করা জরুরি।
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা উচিত।
- অতিরিক্ত রোদ ও গরমে না থাকা ভালো, এতে পানিশূন্যতা ও ক্লান্তি বাড়তে পারে।
- নিয়মিত হালকা হাঁটা বা চলাফেরা করলে রক্তসঞ্চালন ভালো থাকে।
- শিশুর নড়াচড়া কম মনে হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
- অসুস্থ বোধ করলে দেরি না করে রোজা ভেঙে পানি বা খাবার গ্রহণ করা উচিত।
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে মানুষের সক্ষমতা ও সুস্থতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গর্ভবতী নারী যদি মনে করেন রোজা রাখলে নিজের বা গর্ভের সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে তিনি রোজা না রাখার অনুমতি পান। পরে সুস্থ অবস্থায় সেই রোজা কাজা করা যায়।
পরিশেষে বলা যায়, গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা একটি সংবেদনশীল বিষয়। তাই সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নিয়মিত চিকিৎসা পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের সুস্থতা নিশ্চিত হলেই গর্ভের শিশুর নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়।
লেখক: ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি